অভিমত এই মাত্র জীবনধারা ব্রেকিং স্বাস্থ্য

স্থূলতা কমিয়ে স্মার্ট থাকার সহজ উপায়

মুনীরউদ্দিন আহমদ

ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরের অভিজাত এলাকায় অতি ওজন ও স্থূলতার প্রবণতা দেখছি কয়েক বছর ধরে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মধ্যে এই প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। বিশ্বব্যাপী মানুষের অতি ওজন ও স্থূলতা মহামারি আকারে যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে করে কয়েক দশকের মধ্যে বিশ্বের বেশিভাগ মানুষ অকর্মণ্য, অথর্ব বা জাতির জন্য বোঝা হয়ে পড়বে। এই উদ্বেগের কথা চিন্তা করে স্থূলতা বা শরীরের বাড়তি ওজন নিয়ে পুনরায় একটি কলাম লেখার কথা বেশ কিছুদিন ধরে খুব গুরুত্বসহকারে ভাবছিলাম। এই কলামটি লেখার পেছনে বাংলাদেশে অতি ওজন ও স্থূলতা সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা অনেকাংশে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

প্রথমেই অতি ওজন ও স্থূলতা সম্পর্কে কিছু পরিসংখ্যান। যুক্তরাষ্ট্রে মুটিয়ে যাওয়া-সংক্রান্ত স্বাস্থ্যসমস্যা মোকাবিলায় ২০০৩ সালে ১১৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়। প্রতিবছর আমেরিকানরা খাবার নিয়ন্ত্রণ ও ওজন কমানোর পেছনে ১৫০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে। প্রচুর চর্বি ও চিনিসমৃদ্ধ খাবার খেলে শরীরের ওজন বেড়ে যায়। বাড়তি ওজন শরীরের জন্য কোনো দিক থেকেই ভালো নয়। পশ্চিমা বিশ্বে ক্যান্ডি, আইসক্রিম, প্রচুর চিনিসমৃদ্ধ খাবার, কোমল পানীয় পান, তেল ও চর্বিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার কারণে মানুষের বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওজন বৃদ্ধি এক জাতীয় সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

শরীরের মাত্রাতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিসজাতীয় বহু রোগের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এসব ভয়ংকর মরণঘাতী রোগের কথা ভেবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্থূলকায় লোকদের ওজন কমিয়ে স্বাভাবিক মাত্রায় নিয়ে আসার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। অতিরিক্ত চর্বি ও ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার শরীরের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কোলেস্টেরল এক সুপরিচিত লিপিড। স্থূলকায় লোকদের শরীরের শিরা উপশিরার অভ্যন্তরীণ দেয়ালে চিনি ও ফ্রি রেডিক্যালের কারণে প্রদাহ ও ক্ষত সৃষ্টি হলে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল (পুড়ে নষ্ট হয়ে যাওয়া), ট্রান্স ফ্যাট, লিপিড বা চর্বিজাতীয় দ্রব্য এবং লাইপোফেইজ পুঞ্জীভূত হওয়ার কারণে শিরা মোটা হয়ে যায় এবং সম্প্রসারণ-সংকোচনক্ষমতা বিলুপ্ত হয়। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক ও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।

শরীরের ওজন বাড়ার পেছনে বিভিন্ন ধরনের কোমল পানীয়র এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। কোমল পানীয়তে প্রচুর পরিমাণে চিনি ব্যবহার করা হয়। ৩৫৫ মিলিলিটার কোমল পানীয়তে ৯ টেবিল চামচ পরিশোধিত চিনি থাকে। ৩৫৫ মিলিলিটার আপকোলায় থাকে ৩৫ চা-চামচ চিনি। দাম কমানোর জন্য ১৯৮০ সাল থেকে কোমল পানীয়তে চিনির পরিবর্তে উচ্চমাত্রার ফ্রুকটোজ কর্নসিরাপ ব্যবহার করা হচ্ছে। এই সিরাপের জন্য যে শস্য ব্যবহার করা হয়, তা আসে জেনেটিক্যালি মডিফাইড ফুড বা পরিবর্তিত প্রজনন শস্য থেকে। কোমল পানীয়তে উচ্চমাত্রায় চিনি বা কর্নসিরাপ ব্যবহার করার কারণে বিশ্বব্যাপী মানুষের বিশেষ করে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীদের ওজন অভাবনীয়ভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

স্থূলকায় লোকদের আরো একটি বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। স্থূলকায় লোকদের খাওয়ার প্রবণতা স্বাভাবিক আকারের লোকদের চেয়ে অনেক গুণ বেশি। খেতে বসলে এরা লোভ সংবরণ করতে পারে না। তার একটি চমৎকার বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। শরীরের ওজন বাড়ার জন্য গ্লুকোজের চেয়ে ফ্রুকটোজের অবদান বেশি। কারণ গ্লুকোজ ক্ষুধা উদ্রেককারী হরমোন গ্রেহলিনকে অবদমিত করে এবং লেপটিনকে উদ্দীপিত করে। এর ফলে ক্ষুধা কমে যায়। অন্যদিকে ফ্রুকটোজের গ্রেহলিনের ওপর কোনো প্রভাব নেই এবং লেপটিনকেও উদ্দীপিত করতে পারে না। ফলে স্থূলকায় লোকদের অতিভোজনের প্রবণতা বেড়ে যায়, যা ওজন বাড়ার অন্যতম এক কারণ।

আগেই বলেছি, পশ্চিমা বিশ্বে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে গত ৩০ বছরে শিশুকালীন স্থূলতা তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশেও এই প্রবণতা বাড়ছে বৈ কমছে না। শিশুদের শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়ার পরিণতি কী, তা জানলে আতঙ্কিত না হয়ে উপায় থাকবে না।

স্থূলকায় শিশুদের ৫৫ বছর বয়সের আগে মৃত্যুহার দ্বিগুণ। স্বাভাবিক ওজনের অল্প বয়সী নারীদের চেয়ে স্থূলকায় নারীরা ৩৬-৫৬ বছরের মধ্যে বেশি মৃত্যুবরণ করে। গবেষকরা তাদের গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন, এই শতাব্দীর মাঝামাঝি ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, হৃদরোগ, ক্যানসারজাতীয় মরণঘাতী রোগের ব্যাপকতার কারণে মানুষের গড় আয়ু পাঁচ বছর কমে যাবে। কোনো কোনো দেশে শৈশবকালীন স্থূলতার কারণে ইতিমধ্যে গড় আয়ু ৪ থেকে ৯ মাস কমে গেছে। বিশ্বব্যাপী স্থূলতার কারণে লাখ লাখ শিশু বা অল্প বয়সী যুবক-যুবতী বয়স্কদের মতো ক্যানসার, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও হৃদরোগের মতো মরণঘাতী রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে।

স্থূলতা বা শরীরের বাড়তি ওজন অসংখ্য মরণঘাতী রোগের উৎপত্তির কারণ বলে আমাদের সতর্ক হতে হবে এবং জনগণের মধ্যে সতর্কতা বাড়াতে হবে। আমরা সচেতন হলে স্থূলতা থেকে রক্ষা পাওয়া এবং শরীরের বাড়তি ওজন ছেঁটে ফেলা কষ্টসাধ্য না। প্রতিবছর ১ কোটি ৫০ লাখ শিশু মারা যায় ক্ষুধার্থ অবস্থায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ক্ষুধার্থ। প্রতি ৩ দশমিক ৬ সেকেন্ডে কোনো একজন মারা যায় ক্ষুধার তাড়নায়।

আমাদের উপমহাদেশ এবং আফ্রিকায় বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষুধার্থ মানুষের বসবাস। নব্বইয়ের দশকে ১০ কোটির বেশি শিশু ক্ষুধার কারণে মৃত্যুবরণ করেছিল। এই লেখাটি পড়তেই পড়তেই কম করে হলেও ২০০ মানুষ ক্ষুধায় মারা যাবে এবং বছরান্তে এই সংখ্যাটি দাঁড়াবে ৪০ লাখে। পৃথিবীর প্রায় ১০০ কোটি মানুষ অপুষ্টিতে ভোগে। বিশ্বব্যাংকের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, অপুষ্টিতে আক্রান্ত এসব মানুষের ৮০ শতাংশ শিশু ও নারী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোর প্রায় ৫০ কোটি শিশু অপুষ্টিতে আক্রান্ত । প্রতিবছর ৫ বছরের কম বয়স্ক প্রায় ৮৫ লাখ শিশু নামেমাত্র বেঁচে থাকলেও উপবাসের কারণে কোনো না কোনো সময় মৃত্যুবরণের জন্য দিন গোনে।

জেনেটিক বা জৈবিক কারণ ছাড়াও মানুষের লাইফস্টাইল বা জীবনপদ্ধতি স্থূলতার জন্য বিশেষভাবে দায়ী। সহজ ভাষায় বলি, মানুষ খাবারের মাধ্যমে অতি বেশি পরিমাণে ক্যালরি গ্রহণ করে যৎসামান্য ক্যালরি খরচ করলে অর্থাৎ পর্যাপ্ত ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম না করলে মানুষের ওজন বাড়তে শুরু করে। তার মানে ক্যালরি গ্রহণ ও ক্যালরি খরচের মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, স্থূলতার সঙ্গে প্রাচুর্যের একটি নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। যাদের প্রচুর টাকাকড়ি আছে, তারা প্রচুর ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার বেশি খায় এবং ঘন ঘন খায়। প্রয়োজনের তুলনায় অতি বেশি ক্যালরি শরীর কাজে লাগাতে পারে না। তাই বাড়তি ক্যালরি শরীর চর্বিতে রূপান্তরিত করে শরীরে পুঞ্জীভূত করে।

যুক্তরাষ্ট্রে ঠিক এই কাজটি ঘটে যাচ্ছে আর তা বিশেষজ্ঞদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান মোতাবেক যুক্তরাষ্ট্রের ৩২ শতাংশ শিশু ও কিশোর অতি মোটা বা স্থূলতায় আক্রান্ত। ৬ থেকে ১১ বছর বয়স্ক ২০ শতাংশ এবং ১২ থেকে ১৯ বছর বয়স্ক ১৮ শতাংশ শিশু-কিশোর স্থূল। যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে এসব শিশু-কিশোর মোটা মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠবে এবং বাকি জীবন স্থূলতা নিয়ে কাটাবে। বিপদ আরো আছে। অতি স্থূল মানুষ অতি সহজে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয় এবং বেশিভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করে। অতিকায় দেহ বা ওজন নিয়ে মানুষ বেশি চলাফেরা বা কাজকর্ম করতে পারে না। এতে করে কর্মক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা হ্রাস পাওয়ার কারণে শারীরিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।

স্থূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মৌলিক পদক্ষেপ হলো কম খাওয়া ও ওজন কমানোর জন্য বেশি পরিশ্রম বা ব্যায়াম করা। বেশি থাকতে কম খাওয়া- এটা এক দুঃসাধ্য বিষয়। আমি পৃথিবীর বহু দেশে গিয়েছি। জাপান ছাড়া আর সব উন্নত দেশেই মানুষের লাইফস্টাইল একই রকম। জাপানিদের খাওয়াদাওয়া সুষম ও স্বাস্থ্যসম্মত বলে সেখানে স্থূলতা এখনো মহামারি আকারে দেখা দেয়নি। কিন্তু অন্যান্য উন্নত দেশে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে খাবারদাবারের প্রাচুর্য চোখে পড়ার মতো, দামেও সস্তা।

উন্নত বিশ্বের শিশু-কিশোর এমনকি প্রাপ্তবয়স্কদের প্রিয় ও আকর্ষণীয় খাবারের তালিকায় রয়েছে আইসক্রিম, জাঙ্ক ফুড ও প্রচুর চিনিসমৃদ্ধ কোমল পানীয়। প্রায়ই সব আইটেমই হয় জাম্বো সাইজের। এসব খাবার অত্যন্ত মুখরোচক হয়। খেয়ে অপরিসীম আনন্দ ও তৃপ্তি পাওয়া যায়। ক্যালরিতে ভরপুর এসব খাবার ঘন ঘন খেলে যেকোনো শিশু-কিশোর অল্প সময়ের মধ্যে মোটা হতে শুরু করলেও তাদের খাবারের প্রতি অনীহা থাকে না এবং আকর্ষণ বাড়ে অতি মাত্রায়। খাবারের প্রতি আকর্ষণ মানুষকে আরো বেশি পরিমাণে খেতে প্রলুব্ধ করে। ফলে ওজনও বাড়ে সমান তালে। আপনার শরীরে ওজন স্বাভাবিক আছে কি না, তা বুঝবেন কী করে?

শরীরের ওজন স্বাভাবিক না বেশি তা নির্ণয় করা হয় বিএমআই বা বডি মাস ইনডেক্স দিয়ে। বিএমআই নির্ণয়ের নিয়মটা মনে রাখবেন। শরীরের ওজনকে উচ্চতার বর্গফল দিয়ে ভাগ করলে যে ফল পাওয়া যাবে তাকে বিএমআই বলা হয়। স্বাভাবিক বিএমআই স্কেল হলো ১৮ দশমিক ৫ থেকে ২৪ দশমিক ৯। আপনার শরীরের ওজন যদি ৬৮ কেজি এবং উচ্চতা ১ দশমিক ৭৩ মি. হয়, তবে আপনার বিএমআই হলো ৬৮ ভাগ (১.৭৩ গুণ ১.৭৩) বা ২:৯৯ এবং ফলাফল ২২.৭৪। ফলাফল অনুসারে আপনার ওজন ঠিক আছে। বিএমআই ২৪ দশমিক ৯-এর বেশি হলে আপনার শরীরের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি এবং ১৮ দশমিক ৫-এর কম হলে ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম ধরা হবে। মনে রাখবেন, শরীরের ওজন কমিয়ে বা বাড়িয়ে বিএমআই স্বাভাবিক পর্যায়ে আনার সুযোগ রয়েছে আপনার।

স্থূলতা কমানোর জন্য ইতোমধ্যে বহু ওষুধ বাজারজাত করা হয়েছে। স্থূলতা কমানোর ওষুধের তালিকায় আরো অনেক ওষুধ অপেক্ষারত, যেগুলো মাত্রাতিরিক্ত ও জটিল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্রদর্শনের কারণে ছাড়পত্র পাচ্ছে না। ওজন কমানেরা ওষুধগুলো সাধারণত পার্শ্বপতিক্রিয়ামুক্ত হয় না। এ ধরনের বেশ কিছু ওষুধের অতীত ইতিহাস ভালো নয়। এসব পার্শ্বপতিক্রিয়ার মধ্যে অন্যতম হলো যকৃতের ক্ষতিসাধন, কিডনি ধ্বংস, অবসন্নতা, মাথাব্যথা, ক্ষুধামান্দ্য। ব্রুকহ্যাভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির মেডিকেল রিসার্চের চেয়ারম্যান ড. জিন জেক ওয়াং বলেন, ‘ওজন কমানোর জন্য আমাদের কাছে কোনো ম্যাজিক বুলেট নেই। সম্ভবত আমাদের বোমা ব্যবহার করার প্রয়োজন হতে পারে। সমস্যাটি উপলব্ধি করার মতো আমাদের ক্ষমতা থাকার দরকার। এমন কোনো ওষুধ পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য, যা শুধু নিরাপদে ওজন কমাবে অথচ কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকবে না।’

এত আলোচনার পর বোঝা গেল ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার অনেকের জন্য এক সমস্যা। ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবারের অতিভোজন আরো বড় সমস্যা। এসব খাবার খেয়ে মোটা হওয়া এক মহাবিড়ম্বনা। আর চিকন হওয়ার জন্য ওষুধ সেবন, সে তো জীবন বিপন্ন করে আপনাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে।

তা হলে উপায়? উপায় একটা আছে। তা শক্ত হলেও অসম্ভব নয়। প্রিয় পাঠক, আপনার শরীরে যদি বাড়তি ওজন থাকে, তবে দেরি না করে আজই ব্রত গ্রহণ করুন ওজন কমিয়ে আনতে। কীভাবে ওজন কমাবেন? আসুন, একটু আলোচনা করি।

এক. চিনি বা ফ্রুকটোজ কর্নসিরাপসমৃদ্ধ খাবার পরিহার করুন।

দুই. আপনার শিশুকে চিনি বা ফ্রুকটোজসমৃদ্ধ ফলমূল ও ফলের রস কম খেতে দিন।

তিন. চিনি বা কর্নসিরাপসমৃদ্ধ কোমল পানীয়তে প্রচুর ক্যালরি থাকে। শরীরে বাড়তি ওজন থাকলে কোমল পানীয় বর্জন করুন। চিনি বা ফ্রুকটোজ কর্নসিরাপ ছাড়াও কোলাজাতীয় পানীয়তে বহু ক্ষতিকর উপাদান থাকে। মনে রাখবেন, চিনি, চিনি বা কর্নসিরাপসমৃদ্ধ খাবার হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের প্রধান কারণ।

চার. শিশুরা জাঙ্কফুড, ফাস্টফুড, ক্যান্ডি, চকলেট, আইসক্রিম ও প্রচুর চিনিসমৃদ্ধ পানীয় বিশেষ করে কোকাকোলা, স্প্রাইট, ফান্টা বেশি পছন্দ করে। আপনার শিশুর সুস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে এসব খাবার শিশুদের প্রদানে সতর্ক ও সচেতন হোন। কথাগুলো বয়স্কদের জন্যও প্রযোজ্য।

পাঁচ. জাঙ্কফুড ও ফাস্টফুড শরীরের ওজন বাড়ায়। কারণ এসব খাবারে প্রচুর তেল বা চর্বি থাকে। এসব খাবার বর্জন করুন বা পরিমিত খান।

ছয়. অলস জীবনযাপন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। নিয়মিত ব্যায়াম না করার কারণেও আমাদের শরীরের ওজন বেড়ে যায়। তাই নিয়মিত ব্যায়াম বা কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। কম বয়সীদেরও ব্যয়ামে উদ্বুদ্ধ করুন।

সাত. পরিমিত কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, লিপিড, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, বিশুদ্ধ পানীয়, আঁশজাতীয় খাবার স্বাস্থ্যকর খাবারের অন্তর্ভুক্ত। উল্লিখিত খাবারের মধ্যে শাকসবজি ও ফলমূলের আধিক্য থাকা বাঞ্ছনীয়। শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশসমৃদ্ধ সুষম খাবার শরীরের ওজন, রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

আট. বিয়েশাদি বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবেশিত তেল, চর্বি ও ঘিসমৃদ্ধ খাবার একান্তই পরিহার করতে না পারলে অল্প খাওয়ার চেষ্টা করুন। এসব অনুষ্ঠানে পরিবেশিত বেশিভাগ খাবার কারো জন্যই স্বাস্থ্যসম্মত নয়।

নয়. লোভ সংবরণ করতে পারলে বহু স্বাস্থ্যসমস্যা দূর হয়ে যায়। খেতে বসলে লোভ সংবরণ করতে পারি না বলে আমরা অতিভোজনের কারণে মোটা হয়ে যাই এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হই। জিহ্বা সংযত করুন, তবেই শুধু আপনার স্বাস্থ্য সুসংহত হবে।

 

তাই আপনি এবং আপনার পরিবারের সব সদস্যের জন্য একটি স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন এবং সুস্থ থাকুন। শরীরের সঠিক ওজন ও সুস্বাস্থ্য আমাদের জীবনে শুধু আনন্দই বয়ে আনে না, সুস্বাস্থ্য আমাদের উপহার দেয় অফুরন্ত কর্মচাঞ্চল্য, উৎসাহ-উদ্দীপনা, শক্তি- যা আপনার জীবনে বয়ে আনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। তাই আসুন, আমরা সবাই সুস্থ, সবল থাকতে সচেষ্ট হই। শরীর ফিট ও সুস্থ থাকলে মানুষকে দেখতেও সুন্দর ও স্মার্ট লাগে। আর এ দুনিয়াতে সুন্দর ও স্মার্ট থাকতে কে না চায়!

লেখক: অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; সাবেক অধ্যাপক, ঢাবি

ই-মেইল: drmuniruddin@gmail.com

Related posts

আরও ৬ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন দেবে চীন

Irani Biswash

যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মেয়র তৈয়বের শপথ

razzak

কিয়েভ থেকে তিন মাইল দূরে রুশ কনভয়

razzak

Leave a Comment

Translate »