নারী সাহিত্য

রমা চৌধুরী

নীলুফা আলমগীর
মধ্যাহ্নের কাট ফাটা রোদ, তীব্র, ভ্যাপসা গরম, চট্টগ্রাম শহরের যে কোন রাস্তায় পথ চলতে গিয়ে হঠাৎ করে চোঁখে পড়ে যেত কাঁধে বইয়ের ঝোলা নিয়ে খালি পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক আপাত বৃদ্ধা। আগুনের মত তপ্ত পিচ ঢালা রাজপথে যাকে খালি পায়ে হেঁটে যাওয়া দেখে থমকে যেতে হতো পথিককে। তিনি রমা চৌধুরী। একাত্তরের বীরাঙ্গনা, মুক্তি যুদ্ধের দাবানলে  ঘর বাড়ি, নিজের সৃষ্টি সর্বোপরি তিন সন্তান হারানো বিপর্যস্ত এক জীবন সংগ্রামী লেখিকা।
রমা চৌধুরী ১৯৪১ সালের ১৪ই অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার পোপদিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম স্নাতকোত্তর (এম এ) নারী। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে কর্ম জীবন শুরু করেন।
মুক্তি যুদ্ধের সময় তিন শিশু সন্তান নিয়ে পোপদিয়ায় গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন। স্বামী তখন ভারতে। একাত্তরে ১৩ মে স্থানীয় এলাকার রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি সেনা বাহিনী
রমা চৌধুরীর বাড়িতে হানা দেয় এবং
নিজের মা আর দুই শিশুসন্তানের সামনেই ধর্ষণ করে। ধর্ষণের পর তাদের হাত থেকে পালিয়ে পুকুরে নেমে যখন আত্মরক্ষার জন্য লুকিয়েছিলেন তখন গান পাওডার দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয় ঘর বাড়ি ও যাবতীয় সম্পদ।
তারপর এলাকাবাসী কেউ কেউ তাঁর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন, কিন্তু নিকটজনেরাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন।
ঘরবাড়িহীন বাকি আটটি মাস তিনি তিনটি শিশুসন্তান আর বৃদ্ধ মাকে নিয়ে জলে-জঙ্গলে লুকিয়ে বেড়িয়েছেন। রাতের বেলায় পোড়া ভিটায় এসে কোনোমতে পলিথিন বা খড়কুটো নিয়ে মাথায় আচ্ছাদন দিয়ে কাটিয়েছেন।
প্রিয় সন্তানদের মায়ায় আত্নহনন থেকে নিবৃত থাকলেও এক ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণার ভিতর দিন কাটাতে থাকেন তবুও জীবন যুদ্ধে হার মানেননি এই বীরাঙ্গনা নারী। শুরু করেন নতুনভাবে পথ চলা।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে সারা দেশ যখন বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত, তখন বোয়ালখালীর পোড়া ভিটের এক কোণে কোলের শিশুকে বাঁচানোর জন্য  প্রাণপণ লড়াই করেছেন রমা চৌধুরী কিন্তু বাচাতে পারেন নি। নিউমোনিয়া আক্রান্ত বড় ছেলে সাগর ২০শে ডিসেম্বর মারা যায়। এরপর ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মারা যায় রমা চৌধুরীর মেজ ছেলে টগর। পুত্রশোকে উন্মাদ রমা চৌধুরী সেই থেকে আর পায়ে জুতা পরেননি।
তৃতীয় সন্তান টুনু ১৯৯৮ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বোয়ালখালীর কানুনগো পাড়ায় সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যায়। হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শব দেহ  পোড়ানোতে বিশ্বাসী ছিলেন না রমা চৌধুরী। তাই তার তিন সন্তানকেই সমাহিত করেছিলেন। মুক্তি যুদ্ধের পর টানা চার বছর জুতো পড়েননি তিনি। এরপর নিকট জনদের পীড়াপীড়িতে অনিয়মিত ভাবে জুতা পড়া শুরু করলেও তৃতীয় সন্তান মারা যাওয়ায় আবার ছেড়ে দিয়েছিলেন জুতা পায়ে দেয়া। এরপর ১৫ বছর ধরে জুতো ছাড়াই চলেন তিনি। আজীবন পরম যত্নে নিজের আবেগ ও মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে গেছেন। প্রবল দুঃখ দুর্দশার মধ্যে থেকেও তিনি কখনো কারো কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি।  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে গণভবনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান। একাত্তরের জননী বইটি উপহার দেন তিনি প্রধানমন্ত্রীকে। তাঁকে সাহায্য করতে চাইলে তিনি সবিনয়ে জানান, নিজের উপার্জনেই তিনি বেঁচে থাকতে চান। আত্মসম্মানবোধ এতটাই প্রবল ছিলো এই সংগ্রামী নারীর।
স্বাধীনতার পরে ২০ বছর লেখা বৃত্তিকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন রমা চৌধুরী। প্রথমে একটি পাক্ষিক পত্রিকায় লিখতেন। বিনিময়ে সম্মানীর বদলে পত্রিকার ৫০ টি কপি পেতেন। সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চলতো জীবন-জীবিকা। পরে নিজেই নিজের লেখা বই প্রকাশ করে বই বিক্রি  করতে শুরু করেন। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় রয়েছে তাঁর পদচারণা। প্রবন্ধ, ছড়া, ছোটগল্প, স্মৃতিকথা, ইতিহাস, সমালোচনামূলক সাহিত্য- এসকল শাখায় লিখে গেছেন তিনি। প্রবন্ধ, কবিতা ও উপন্যাস মিলিয়ে তিনি নিজের ১৮ টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হলঃ
একাত্তরের জননী,  আগুন রাঙা আগুন ঝরা অশ্রু ভেজা একটি দিন, সেই সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদের জিজ্ঞাসা, স্বর্গে আমি যাবো না, ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ, চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে জীবন দর্শন, অপ্রিয় বচন, লাখ টাকা, হীরকাঙ্গুরীয়, ১০০১ দিন যাপনের পদ্য ইত্যাদি।
 মুক্তযুদ্ধকালীন সময়ে নিজের জীবনের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা লিখে গেছেন তাঁর রচিত ‘একাত্তরের জননী’ গ্রন্থে।
“সেদিন আমাদের পাড়ায় কত মেয়েকে যে ধর্ষণ করেছে পিশাচগুলো তার কোনো ইয়ত্তা নেই। যুবতী মেয়ে ও বৌ কাউকেই ছাড়েনি। গর্ভবতী বৌ, এমনকি আসন্ন প্রসবারাও বাদ যায়নি। এসব কথা জানতে পেরে আমি অন্তরের গ্লানি ভুলে নিজেকে কোনোমতে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলেও মা কিন্তু আমার গর্ভে হানাদারের সন্তান আসতে পারে ভেবে আতংকে ও উদ্বেগে ছটফট করতে থাকেন।”
দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হাড়ের ব্যথাসহ নানা রোগে ভোগার পর ২০১৮ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর রমা চৌধুরী মৃত্যুবরন করেন। রমা চৌধুরীর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী বোয়ালখালী উপজেলার পোপদিয়া গ্রামে তাঁর   সন্তান টুনুর পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।  তিনি লিখেছিলেন ‘যাব না, ভাই, যাব না/ স্বর্গে আমি যাব না/দুধের নদী, ক্ষীরের সাগর/ যতই সেথা থাকুক না/চাই না যেতে স্বর্গে আমি /যদি বকুল সেথা নাহি ফোটে’ (স্বর্গে আমি যাব না)।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে এই বীরাঙ্গনা মহীয়সী নারী  দীর্ঘ চলার পথে প্রতিটি বাঁকে যুদ্ধ করেছেন নিষ্ঠুর এই সমাজের বিরুদ্ধে, প্রতিকূল  পারিপার্শ্বিকতার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশে তথা সমগ্র বিশ্বে স্বরণীয় হয়ে থাকবে
অসীম সাহসী ও সংগ্রামী এই একাত্তরের জননী যার নাম রমা চৌধুরী।
তথ্যসূত্রঃ ১) উইকিপিডিয়া

Related posts

একুশে গ্রন্থমেলায় ডাঃ ফারহানা মোবিনের স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ক বই ‘সুস্থ থাকতে চাই’

Mims 24 : Powered by information

কবরীকে নিয়ে ববিতার স্মৃতিচারণ

Irani Biswash

তলোয়ার দিয়ে কেক কাটলেন রানী এলিজাবেথ

Irani Biswash

Leave a Comment

Translate »