সম্পাদকীয় সাহিত্য

জোড়াসাঁকোর ভেতর বাড়ি একদিন

ইরানী বিশ্বাস

বৈবাহিক সূত্রে আমি কোলকাতার বউ ছিলাম। সেখানে একসময় আমি বসবাস করতাম। তারপর সেখানকার পাঠ চুকিয়ে বাংলাদেশেই স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা হয়। অনেক চড়াই উতরাই পার হয়ে ঢাকায় থিতু হয়েছি। এতবছর কোলকাতা বসবাস করেও আমি রবি ঠাকুরের বাড়ির ধূলো মাড়ানোর সৌভাগ্য হয়নি। যাই হোক, ২০০৯ সালের কথা। ঢাকা থেকে কোলকাতা গিয়েছিলাম কোন এক কাজে। হাতে কিছুটা সময় থাকায় মনে হলো, এবার কোন ভাবেই রবি’র বাড়ি না দর্শন করে ঢাকা ফিলবো না। অগত্যা হলুদ ট্যাক্সি করে রওনা হলোম। ট্যাক্সিওয়ালা গতি থামিয়ে বললেন, চলে এসেছি। আমি তাকিয়ে দেখি আমরা কলকাতার ৬ নং দ্বারকানাথ সড়কের একটি সুসজ্জিত গেটের সামনে আছি। বেশ মনোমুগ্ধকর কারুকাজে শোভিত একটি গেট চোখে পড়ছে। গেটের দুই পাশের স্তম্ভে পোড়ামাটির ফলকে দুটি কবিতা লেখা আছে। নিচে সই করে লেখা আছে শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাঙ্গালীজাতির ইতিহাসে এ নামটি একটি বড় জায়গা দখল করে আছে। বলা যেতে পারে বাংলাসাহিত্যের আকাশে তিনি দিকনির্দেশক ধ্রæবতারা। ১৮৬১ সালের ৭ মে বাংলা ১২৬৮ সালের ২৫ বৈশাখ এই বাড়িতেই জন্ম হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের। বাঙ্গালী তথা সাহিত্যামোদি মানুষের কাছে এ বাড়িটি এখন একটি তীর্থস্থানে পরিনত হয়েছে। জোড়াসাঁকো এ গলিটির নাম ছিল মেছো কলোনী। কালের বিবর্তনে এটি এখন বিখ্যাত ৬ নং দ্বারকানাথ লেন, জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ি নামে পরিচিত।
বাড়ির ফটক ডিঙিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে মনটা আপনি বিচলিত হবে। চোখের সামনে আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে থাকা একটি তিনতলা ভবন যেন আহŸান করছে, এসো এসো আমার ঘরে এসো আমার ঘরে…। কিন্তু বাদ সাধে ওখানকার কর্তব্যরত মানুষেরা। একটি গেটপাশ না নিয়ে কিছুতেই ঢুকতে দেবে না। ১০ রুপি মুল্যের একটি গেট পাশ হাতে দিয়ে লোকটি সব নিয়ে নিলেন যা ছিল আমার কাছে, আমি সব সপিনু তারে, যা ছিল আমার হয়ে…। মুল ফটক থেকে ভেতরে ঢোকার রাস্তার ঠিক বাম দিকে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। কতো মানুষের সমাগম। যেন মর্তের বাসিন্দা যত, খুজে সারা অমর্ত্যকে…। বিশ্বভারতীর সামনে একটি বড় চালতা গাছ দাঁড়িয়ে আছে। তার ছায়ায় আশ্রিত কামিনিসহ নাম না জানা অনেক ফুলের লতা। সবুজ গাছের ঝোপের আড়ালে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে লাল দালান। এ বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ সংসার পেতেছিলেন।
ডান পাশে বাগান পেরিয়ে সারি সারি ঘর। এখানে বিশ্বভারতীর ক্লাশ করানো হয়। প্রিন্স দ্বারকানাথের বিলাসবহুল বাড়ির গেটের দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে দুটি মুর্তি। এক পাশে রবীন্দ্রনাথের, অন্যপাশে প্রিন্স মাহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের মুর্তি। বাম দিকের সিড়ি বেয়ে ওঠার আগে পায়ের জুতা খুলতে ভুলবেন না। সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে কানে ভেসে আসবে ক্ষিন শব্দের রবীন্দ্র সংগীত। সুনসান নিরবতা ভেদ করে সুরের এই মুর্ছনা আপনাকে নিয়ে যাবে সুরের দেশে। এ বাড়ির বাতাসে যেন সারাক্ষন সুর আর কথার খেলা চলে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার সময় একটি কথা বার বার মনের মধ্যে প্রশ্ন হয়ে ঘুরপাক খায়। বিরাট বাড়ি কিন্তু তার সিড়িগুলো এত ছোট যে দুইজন মানুুষ পাশাপাশি উঠতে বা নামাওঠা করতে পারবে না। সিঁড়িগুলো লালকার্পেটে মুড়ে রেখেছে, সেখান দিয়ে হাঁটার সময় নিজেকে বেশ সুখি সুখি মনে হয়। এর অবশ্য একটা কারন আছে, এ বাড়িতে ঢোকার পর কেবলি মনে হতে থাকে এ বাড়ির মাটিতে এক সময় রবীন্দ্রনাথ হেঁটেছে, খেলা করেছে। আজ এত বছর পর এই মাটি স্পর্শ করছে নতুন প্রজন্ম। এটা কি কম কথা? মনে হতে পারে, এ বাড়ির এখানে সেখানে এখনো যেন তাঁর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।
ডান পাশের লালবাড়িটির দোতলার চৌকাঠ পেরিয়ে ঢুকতেই রবীন্দ্রনাথের বসার ঘর। একটি টি-টেবিল ঘিরে তিনটি আরাম কেদারা বিছানো রয়েছে। যেটিতে কবি বসতেন সেটি সুসজ্জিত রয়েছে। মনের অজান্তে স্পর্শ করতেই, মনের মধ্যে গেয়ে উঠবে, একদিন এই খানে বসে তুমি লিখেছিলে যে কথা, পেয়েছি পেয়েছি সে বারতা…। এ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলে বিরাট এক ঘর। এখানেই আলমারী দিয়ে পার্টিশন করে তিনটি ঘর করা হয়েছিল। মৃনালীনি দেবীর শেষ শয্যা এখানেই পাতা হয়েছিল। সারারাত মৃনালিনী দেবীর মৃত্যু শয্যা পাহারা দেয়ার পর কবি চলে গিয়েছিলেন ছাদে। এ ঘরটির ঠিক পেছনে রয়েছে খুব সাদামাটা একটা রুম। উত্তর পাশ জুড়ে খোলা জানালা। পশ্চিমে একটি বেলজিয়াম আয়নার ড্রেসিং টেবিল। একটি সেলফে এখনো সাজানো আছে রূপার বক্স। রবীন্দ্রনাথের রূপার গ্যাস এবং কয়েকটি বিলেতি শো-পিচ। যা রবীন্দ্রনাথ বিলেত থেকে আসার সময় সঙ্গে করে এনছিলেন। রুমটির একটি দেয়ালে মৃনালিনীর একটি বড় ছবি বাঁধানো। তার নীচে মৃনালীনির নিজের হাতে রবীন্দ্রনাথকে লেখা একটি পত্র রয়েছে। অন্য দেয়ালে কবির নিজের হাতে লেখা নিজের বিয়ের নিমন্ত্রন পত্র রয়েছে। এ ঘরে প্রতি রাতে বা দিনে কবির সাথে কবি পতœীর প্রেম-প্রনয় বা মান-অভিমান খেলা চলতো। সামনে বড় বারান্দা। এ বারান্দাতেই মৃনালিনী দেবী ভাসুরপো বলেন্দ্রনাথের কাছে সাহিত্য পড়া শুনতেন। সিঁড়ি দিয়ে নেমে একটু ঘুরে অপর পাশ দিয়ে অন্য সিঁড়ি বেয়ে যেতে হয় অন্য দালানে। এখানে প্রথম ঘরটিতে রয়েছে কবির ব্যবহৃত পোশাক। একটি বড় আয়না। কবি যতবার পারিবারিক নাটক করেছেন, এই ঘরে এই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখেছেন। বারান্দা ঘুরে অন্য ঘরে গেলে স্তব্ধ হয়ে যেতে হবে। এখানেই কবি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। দেয়ালে টাঙানো রয়েছে কয়েকটি ছবি। যা তাঁর রোগশয্যার চিহ্ন মাত্র। এর পেছনের ঘরটিতে পর্দা টেনে কবির শেষ অপারেশন করানো হয়েছিল। আরো সমানের ঘরটি কবির লেখার ঘর। গন্য-মান্য ব্যক্তিবর্গ এখানে এসে মজলিস বসাতেন। কবি ছিলেন মধ্যমনি। অতিথিদের সাথে খোশ গল্প করতে কবি খুব পছন্দ করতেন। ঘোরানো বাড়ির মাঝে উঠোন রয়েছে উদম। ফাঁকা উঠানের দিকে তাকালে মনে হয় এই বুঝি দাস-দাসিদের নজরে পড়বে। চারপাশে ঘোরানো বারান্দা। বারান্দা ধরে অনায়াসে এক বাড়ি থেকে অন্যবাড়ি চলে যাওয়া যায়। এক একটি বাড়িতে রয়েছে অনেকগুলি ঘর। প্রত্যেকটি ঘর বেশ প্রসস্ত। দেয়ালে টাঙানো স্মৃতিচিহ্ন ছবি শোভা পাচ্ছে। প্রত্যেক ঘরে রয়েছে ঠাকুর বাড়ির ব্যবহৃত সে সময়কার অনেক অনেক স্মৃতি। কোলকাতা মিউনিসিপলিটির দেয়া একটি বিরাটাকারের ব্রাভিয়া টেলিভিশন রাখা আছে। এখানে দেখানো হয় ঠাকুর পরিবারের ঐতিহ্য ও কয়েক পুরুষের তোলা ছবি। বিশেষ বিশেষ ঘরের ছবি ও ব্যবহৃত তৈজসপত্র। এছাড়া একটি ঘরের দেয়াল জুড়ে বড় বড় ছবি বধানো রয়েছে। এখানে পর্যায়ক্রমে প্রিন্স দ্বারকানাথ থেকে রবীন্দ্রনাথের ছবি পর্যন্ত রয়েছে। সামনের বারান্দায় একটি বিশেষ টেবিলে কাঁচে ঘেরা রয়েছে একটি ট্রেন। শান্তিনিকেতন থেকে শেষ যে ট্রেনে করে কবি জোড়াসাঁকো এসেছিলেন। সে ট্রেনটির একটি রেপ্লিকা তৈরি করে ইন্ডিয়ান রেলওয়ে জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে উপহার দিয়েছেন।
একটি ছোট্ট সিড়ি ডিঙিয়ে যেতে হয় অন্য বাড়িতে। এখানকার ঘরগুলো সব হিজিবিজি ভাবে বিন্যস্ত। কোন কোন ঘরে চাকর বাকরা থাকতেন। কোন কোন ঘরে গল্পের মজলিস বসতো। কোথাও রয়েছে বুদ্ধদেবের মুর্তি। তিব্বত থেকে কবিকে দেয়া নানান উপহার সামগ্রী। চায়নার অনেক বন্ধুদের সাথে তোলা কবির অনেক ছবি। কখনো লাঠিয়ালবেসে কখনো হাতির পিঠে, বক্সার রবীন্দ্রনাথ এবং শিকাগোর কবিদের সাথে তোলা বিভিন্ন পোঁজের ছবি।

জানা যায়, জাপানী নামীদামী ব্যক্তি বর্গদের উপস্থিতি উপলক্ষ্যে ঠাকুরবাড়িতে প্রথম চা খাওয়ার বন্দোবস্তো করা হয়েছিল। সে উপলক্ষ্যে বিশেষ আকৃতির চায়ের সরঞ্জাম তৈরি করা হয়েছিল। কাঠের চুলার পরিবর্তে দোতলাতেই কয়লার চুল্লির বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সে স্মৃতি ধরে রাখতে এখনো সেখানে কৃত্রিম কয়লার আগুন, কেতলী ও কাঠের তৈরি চামচ, আর কয়েকটি মগ রাখা আছে। সে বিছানায় বসে তারা সময় কাটিয়েছিলেন সেটি সংরক্ষিত করা হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থায়। কবির সাথে তোলা সেই বিখ্যাত ব্যক্তিদের ছবি এখনো সে বিছানায় শোভা পাচ্ছে। বাড়ির আয়তন ও কক্ষ দেখে অনায়াসে অনুমান করা যায় এ বড়িতে প্রায় ১০০ লোকেরও বেশি মানুষ বাস করতো। বাড়ির ছাদগুলো এমন ভাবে করা যেন দোতলার মানুষও ছাদের স্বাদ পায়। কবির লেখায় বা কবি সর্ম্পকিত লেখায় বার বার এই ছাদেও কথা চলে এসেছে। সত্যি ছাদ যেন মনের বাড়ি। এই ছাদে অনুষ্ঠিত হয়েছে সখী সমিতি। রবীন্দ্রনাথের রাজা ও রাণী নাটকের মঞ্চায়নও হয়েছে এই ছাদে। এ ছাদ ঘিরে বাংলা সাহিত্যে অনেক কথা অনেক গল্পের জন্ম হয়েছে। তাই হয়তো এ ছাদের একটা বিশেষত্ব রয়ে গেছে বাঙালীর হৃদয়ে।
সিড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠলে চোখে পড়বে একটি কক্ষ। খুব বেশি বড় নয়। এখানে প্রিন্স দ্বারকানাথের ছবি বাঁধানো আছে। এছাড়া আছে কিছু বইপত্র ও শাস্ত্রীয় বই। এ ঘরটিতে কবি মাতা সারদাদেবি তাসের আসর জমাতেন সখীদের সাথে। কখনো কখনো দাসীদের সাহায্যে শরীরের ব্যায়াম করাতেন। এ ঘরটির ভেতর দিয়ে একটি দরজা রয়েছে। তার ওপারে মহর্ষি দেবেন্দ্র নাথের কক্ষ। রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা’ য় পাওয়া যায়, তিনতলায় বাবার ঘরে ঢুকে তিনি দরজা বন্ধ করে সময় কাটাতেন। এখানে দেবেন্দ্র নাথের কক্ষে এখনো শোভা পাচ্ছে কুচকুচে কালো একটি মজবুত খাট। খুব জমকালো না হলেও দেখলে মনে হয় আভিজাত্যের ছোঁয়া আছে। পাশে সেল্ফে রাখা আছে জমিদারীর কিছু নথিপত্র, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। এছাড়া শাস্ত্রীয় বই রাখা আছে। দুটি বিশেষ ধরনের জলচৌকি। একটিতে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ বসতেন অন্যটি সামনে থাকতো। এখানে বসেই তিনি উপাসনা করতেন। কখনো কখনো শাস্ত্র পাঠ করতেন।

তিনতলা থেকে সোজা নেমে জুতা সংগ্রহ করে আবার যেতে হবে অভ্যর্থনাকক্ষে। সেখানে রক্ষিত ক্যামেরা, বা যাবতীয় জিনিস সংগ্রহ করে বের হতে হবে। বাগানের উঠোনে দাঁড়িয়ে ইচ্ছে করলে ছবি তোলা যাবে। এখানে কোন রকম সংরক্ষন নেই। সোজা পথ ধরে হাটতে থাকলে হাতের বাম দিকে চোখে পড়বে একটি গ্যারেজ। এখানে একটি গাড়ি রাখা আছে কালো রঙ্গের। এটি মুলত রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত গাড়ি। এটি এখন বিশ্রামে আছে। এর যাত্রী ছুটি নেবার পর এটি ছুটি পেয়েছে অনন্তকালের। আর সাক্ষি হয়ে আছে একটি অধ্যায় একটি কালের।

Related posts

কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা বাংলা একাডেমির নতুন মহাপরিচালক

Irani Biswash

আমার আমি

Mims 24 : Powered by information

শেখ কামাল : বহুমাত্রিক প্রতিভাবান সংগঠক

razzak

Leave a Comment

Translate »