ডিসেম্বর ৭, ২০২২
MIMS 24
আইন ও বিচার আন্তর্জাতিক জাতীয় বাংলাদেশ ব্রেকিং শিক্ষা সম্পাদকীয়

জাপানীদের পূজনীয় বাঙালী ড. রাধা বিনোদ পাল

ইরানী বিশ্বাস

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জয়ী মিত্রশক্তির বিপক্ষে এবং জাপানিদের পক্ষে যুগান্তকারী রায় দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন বাংলাদেশী কৃতীসন্তান ড. রাধা বিনোদ পাল । কুষ্টিয়ার মিরপুর কাকিলাদহের এই কৃতীসন্তানকে নিয়ে সরকারি উদ্যোগে একটি সংগ্রহশালা নির্মাণের কথা থাকলেও সেটি আজও তেমন ভালোভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। আজ সেই রাধা বিনোদ পাল সম্পর্কে লিখতে বসেছি।

১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের মৌজা সালিমপুরের অধীন তারাগুনিয়া গ্রামে মাতুলালয়ে জন্ম গ্রহণ করেন ড. রাধা বিনোদ পাল। এলাকাটি এখন জজপাড়া নামে পরিচিত। তার পিতার নাম বিপিন বিহারি পাল।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ছাতিয়ান ইউনিয়নের ছাতিয়ান গ্রামের গোলাম রহমান পণ্ডিতের কাছে তাঁর শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি। প্রাথমিক জীবন  চরম দারিদ্রের মধ্যে অতিবাহিত হয়েছে।  তিনি তৎকালীন নদিয়া জেলার (বর্তমান কুষ্টিয়া) তারাগুনিয়া এল.পি স্কুলে (বর্তমানে তারাগুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়) ও পরে কুষ্টিয়া হাইস্কুলে তিনি মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। ১৯০৮ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সিয়াল কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণীতে গণিতে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে ১৯১১-১৯২০ সাল পর্যন্ত তিনি অধ্যাপনা করেন। ১৯২০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলএম পাশ করে কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। অতঃপর একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯২৪ সালে। আইন পেশায় নিয়োজিত থেকে ১৯১৩ সালে প্রণীত ভারতবর্ষের আয়কর আইনের সময়োপযোগী সংস্করণ করেন। ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সরকারের আয়কর আইন-সংক্রান্ত উপদেষ্টা ও ইউনিভার্সিটি ল’ কলেজের অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত হন।

১৯৪১ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক মনোনীত হন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে কাজ করেন ১৯৪৪-৪৬ সাল পর্যন্ত। প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব রাধা বিনোদ পালের সুখ্যাতি শুধু তৎকালীন পাকিস্তান-ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ১৯৪৬-৪৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত জাপানের রাজধানী টোকিও মহানগরে জাপানকে নানচিং গণহত্যা সহ দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধে চীনাদের উপর জাপানি সেনাবাহিনীর দীর্ঘ কয়েক দশকের নৃশংসতার অভিযোগে যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত করে যে বিশেষ আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হয়। অক্ষশক্তিকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে নুরেমবার্গ এবং টোকিওতে দুটি ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। হিটলারের মন্ত্রিপরিষদ এবং যুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিচার করা হয় নুরেমবার্গে এবং জাপানের সমরবিদ জেনারেল হিদেকি তোজোর বিচার করা হয় টোকিও ট্রাইব্যুনালে। টোকিও ট্রাইব্যুনালের অন্যতম প্রধান বিচারপতি ছিলেন ড. রাধা বিনোদ পাল।

বিচারের একপর্যায়ে রাধা বিনোদ পাল বাদে অন্য সব বিচারপতি জেনারেল তোজোকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করে ফাঁসিতে ঝুলানোর সিদ্ধান্ত নেন। অন্যান্য বিচারপতির ধারণা ছিল, বিচারপতি পালও মিত্রশক্তির পক্ষে অনুগত থাকবেন। কিন্তু বিচারপতি রাধা বিনোদ পালের ৮শ’ পৃষ্ঠার ঐতিহাসিক রায় মিত্রশক্তি এমনকি বিশ্বকে হতবাক করে দেয়। আইনের শাসনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল বিচারপতি পাল কর্তৃক পূর্ববর্তী রায়কে বিতর্কিত প্রমাণ করে যুক্তি দেন।

মিত্রশক্তির তিন প্রধান কর্তৃক স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দ্রুত স্তিমিতকরণে প্রথাগত অস্ত্রের অনুশীলন সম্পর্কিত ঘোষণা, আন্তর্জাতিক আইনের সংযম ও নিরপেক্ষতার নীতিমালা লঙ্ঘন।
জাপানের আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত উপেক্ষা করে ভয়ানক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টিকারী আণবিক বোমা ব্যবহার করা হয়েছিল।

১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত ইয়াল্টা সম্মেলনে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট, রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট জোসেফ স্ট্যালিন ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ দ্রুত স্থিমিতকরণে প্রচলিত অস্ত্র প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। কোন যুক্তিতে জাপানের বিরুদ্ধে আণবিক বোমা ফেলা হয়? এছাড়াও জাপান যখন যুদ্ধ চলাকালীন সময়ই আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত দিয়েছে তখন তার ওপর পারমাণবিক অস্ত্রের আঘাত অমানবিক এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। জাপানের আত্মসমর্পণের প্রমাণ আদালতের কাছে রয়েছে। তা সত্ত্বেও আমেরিকা কেন ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট হিরোশিমায় এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে ১২ হাজার কিলোটন উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয়তাসম্পন্ন আণবিক বোমা ফেলে হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে যথাক্রমে ২ লাখ ১৭ হাজার ১৩৭ জন এবং ৭০ হাজার শিশু ও নারীসহ নিরীহ জনগণকে হত্যা করে। হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমার আক্রমণ ইউরোপে ক্রমাগত স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়ে দেবে। বিচারপতি রাধা বিনোদ পাল রায় হয়তোবা জেনারেল তোজোসহ ৭ জনের ফাঁসি কার্যকর করতে তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেনি। কিন্তু মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার, শান্তি ও আইনের শাসনের পক্ষে সুদৃঢ় অবস্থান বেশ প্রশংসিত হয়। ড. বিনোদ পাল ভালোবেসে ফেলেছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপানকে। তিনি বিশ্বাস করতেন, জাপান একদিন অর্থনৈতিক ও শিল্পসমৃদ্ধ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

ড. রাধা বিনোদ পালকে সম্মান জানাতে কুণ্ঠিত করেনি জাপানের জনগণ। জাপানে তার স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য গঠিত হয়েছে পাল ফাউন্ডেশন। আন্তর্জাতিক আইনের পণ্ডিত ড. রাধা বিনোদ পাল পরবর্তী সময়ে একাধিকবার আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের বিচারপতি ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি জাপান-বন্ধু ভারতীয় বলে খ্যাতি অর্জন করেন। রাধাবিনোদ পালকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি প্রদান করা হয় নিহোন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে ১৯৬৬ সাল। জাপান সম্রাট হিরোহিতোর কাছ থেকে জাপানের সর্বোচ্চ সম্মানীয় পদক ‘কোক্কা কুনশোও’ গ্রহণ করেছিলেন। জাপানের রাজধানী টোকিও তে তার নামে রাস্তা রয়েছে। তিনি জাপান-বন্ধু ভারতীয় বলে খ্যাতি অর্জন করেন।   কিয়োটো শহরে তার নামে রয়েছে জাদুঘর, রাস্তার নামকরণ ও স্ট্যাচু। টোকিও ট্রায়াল টেলিসিরিয়ালটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের ট্রায়াল নিয়ে নির্মিত হলে তার চরিত্রে অভিনয় করেন ভারতীয় অভিনেতা ইরফান খান।  ১৯৫৯ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মভূষণ ও জাতীয় অধ্যাপকের সম্মানে ভূষিত করেন।

ড. রাধা বিনোদ পাল ছিলেন নয়টি কন্যার জনক (শান্তি রানী, আশা রানী, লীলা রানী, বেলা রানী, নীলিমা, রোমা রানী, রেনুকা রানী, লক্ষ্মী রানী এবং স্মৃতি কনা) এবং পাঁচ পুত্র (প্রশান্ত কুমার, প্রদ্যুৎ কুমার, প্রণব কুমার, প্রতাপ বিজয় এবং প্রতুল কুমার)। এক পুত্র, প্রণব কুমার পালও আইনজীবী (ব্যারিস্টার) হয়েছিলেন, যেমন তাঁর দুই জামাই বলাই লাল পাল (যার সাথে তিনি সহ-রচনা করেছিলেন একটি বই  ) এবং দেবী প্রসাদ পাল (তিনিও দায়িত্ব পালন করেছিলেন) কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক এবং ভারতের অর্থ প্রতিমন্ত্রী হিসাবে)। মহান এই আইনবিদ ১৯৬৭ সালের ১০ জানুয়ারি মারা যান।

যে বাঙালীকে নিয়ে জাপান কিংবা ভারত গর্ববোধ করে, সেই মহান ব্যক্তির নাড়ি কিন্তু পোতা রয়েছ এই বাংলায়। অথচ বাংলার অধিকাংশ মানুষই তার নাম জানে না। অথবা তাঁর নাম জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি স্বাধীনতা পরবর্তী কোন সরকার। একজন বাঙালী হিসেবে এ বড়ই লজ্জার বিষয়।

Related posts

জার্মানি, সুইডেন ও পোল্যান্ডের কূটনীতিকদের বহিষ্কার করল রাশিয়া

Mims 24 : Powered by information

বাইডেন প্রশাসনে যুক্ত হয়েছেন নরসিংদীর মেয়ে ফারাহ আহমেদ

Mims 24 : Powered by information

অদৃশ্য কারণে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা

Irani Biswash

Leave a Comment

Translate »