অভিমত জুবাইদা গুলশান আরা হেনা নারী প্রিয় লেখক সম্পাদকীয় সাহিত্য

“রোদেলা আকাশে কালো মেঘ”

জুবাইদা গুলশান আরা হেনা
রোদেলা, ব্লগে লেখা তোমার লেখাটা অত্যন্ত চমৎকার। তোমার রচনাশৈলী সত্যিই প্রশংসনীয়।
খুশী করার জন্য বলছো না তো!
দূরের মানুষ খুশী করার জন্য বলে। কিন্তু আপনজনরা ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দেয়। তোমার লেখাটা পড়ে কষ্টে আমার বুকটা ব্যথা হয়ে গেছে। গল্পের নায়িকা জারিনের জন্য অন্যরকম একটা অনুভূতি কাজ করছে। যেমন কাজ করে তোমাকে নিয়ে।
আমাকে নিয়ে তোমার কোন অনুভূতি কাজ করে বলোনি তো কোনদিন?
না বললেই যে অনুভূতি কাজ করবে না আর বললে কাজ করবে এটা আসলে ঠিক নয়! গল্পটা পড়ার সময় জারিনের মাঝে আমি রোদেলাকে আবিষ্কার করেছি।
জারিনের পরিণতি আমার কাম্য নয়। আমার জীবনে চমকে দেয়ার মত কিছু চাই না। আর দশটা মেয়ের মত স্বাভাবিক জীবনই আমার চাওয়া।
কিন্তু তুমিতো দশ, একশো কিংবা হাজারো মেয়ের মত নও। লাখের মধ্যে তোমার মত হয়তো কাউকে পাওয়া যাবে।
একান্ত কাছের মানুষটির মুখে নিজের মূল্যায়ন শুনতে ভালই লাগে রোদেলার। আকাশের সাথে কথা বলতে গেলে দুই তিন ঘণ্টা সময় অবলীলায় কেটে যায়। কাল পরীক্ষা জানলে আকাশ হয়তো মোবাইল রেখে দেবে। পরীক্ষার কথা বলতে গিয়েও থেমে যায় রোদেলা। একপর্যায়ে আকাশই জানতে চায় আগামীকাল পরীক্ষা আছে কিনা! যা ভেবেছিলো ঠিক তাই। পরীক্ষার কথা শুনেই পাকা অভিভাবকের মত বললো, রোদেলা খেয়ে দেয়ে লক্ষ্মী মেয়ের মত পড়তে বসো।
রাত জেগে পড়াশুনা করার অভ্যাস আছে রোদেলার। শুধু পড়াশুনা কেন কথাবলে কাটিয়ে দিয়েছে আকাশের সাথে বহুরাত। পড়ার টেবিলে বসে আকাশের দুষ্টুমিগুলো মনে পড়ছে আবার কখনো হাসছে, কখনো বা হারিয়ে যায় অন্য এক জগতে। আকাশের সাথে রোদেলার এক অদ্ভুত ধরনের খেলা হয়। আকাশ আমেরিকায় আর রোদেলা ঢাকায়। ওখানকার সব রোমান্টিক জায়গায় ঘোরে রোদেলাকে সাথে নিয়ে। রোদেলাও কখনো সমুদ্র সৈকতে ঝিনুক কুড়ায়। কখনো বা সমুদ্রে সাঁতার কাটে আকাশকে নিয়ে। আবার কখনো নীলগিরিতে মেঘ ছুঁয়ে দেখে। এ যেন ভিন্ন ধরনের রোমাঞ্চ। অনুভবে একজন আর একজনকে পায়। কল্পনার সিঁড়িতে ভর করে স্থান থেকে স্থানান্তরে ঘুরে বেড়ায়।
রুমমেট চঞ্চলা এসে চোখের সামনে আঙ্গুল ধরে বললো, দেখতো কয়টা আঙ্গুল! বাস্তবে ফিরে আসে রোদেলা।
চঞ্চলা বললো, রোদেলা তোর গল্পটা অসাধারণ। বলতো জারিন মেয়েটাকে এত কষ্ট কেন দিয়েছিস?
তুই এমন করে ভাবছিস কেন? এটা তো গল্প!
পড়তে গিয়ে আমার কিন্তু গল্প মনে হয়নি। জারিনের স্বপ্ন ছিল সাতটা বসন্ত পার করে বিয়ের পিঁড়িতে বসবে। যে জারিন না দেখেই চার বছর ধরে সানিকে ভালবাসতো। দীর্ঘ চার চারটি বছর জারিন যাকে নিয়ে স্বপ্নের বাসর সাজালো তুই কিনা তাকে লাশ বানিয়ে তার প্রিয়ার সামনে নিয়ে এলি। এত নিষ্ঠুর হয়েছিস কিভাবে?
আসলে লিখতে গিয়ে কখন যেন জারিনের মাঝে নিজের ছায়া দেখেছি। এটা তোকে বিশ্বাস করতেই হবে।
লেখকদের এমন হওয়াটা স্বাভাবিক। জীবনের সাথে মিশে গেলেই লেখাটা প্রাণবন্ত হয়।
এমন সমাপ্তি আমি চাই না চঞ্চলা। আকাশকে না দেখেই আমি ওর প্রতি অনেক মোহগ্রস্থ হয়ে পড়েছি। ও যা বলে মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনি। কখনো মনে হয় কোন এক বিখ্যাত কবির কবিতা, কখনো বা মনে হয় কোন গীতিকারের লেখা হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া গান। যাকে না দেখে এত আকর্ষণ তাকে কাছে পেলে আমি কী নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবো!
রোদেলা, আমাদের মেডিকেল কলেজ-এর সুন্দরীদের মধ্যে তোকেও একজন ধরা হয়। অনেক ছেলের স্বপ্নের রানী তুই। আর তুই কিনা ধরা পড়ে গেছিস ফেসবুকে!
ধরা পড়ে যাবোতো কোনদিন ভাবিনি। সবার আগে আমি পড়াশুনার গুরুত্ব দিই। তুইতো জানিস বাবা মার একমাত্র সন্তান আমি। মেয়েকে নিয়ে তাঁদের অনেক স্বপ্ন, অনেক গর্ব। আমাকে নিয়ে কেউ কোনদিন তাঁদের কাছে নালিশ করেনি। আব্বুর বন্ধুরাও বলেন, তোমাকে আল্লাহ্ সব কিছুই দিয়েছে। আমরা দেখি পয়সাওয়ালা লোকের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ায় ভাল হয় না। সেইদিক থেকে তুমি অনেক ভাগ্যবান।
একদিকে ভাল করেছিস, মনের মানুষ সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে। তোর ভুল পথে পা বাড়াবার সুযোগ নেই। ভুলটা আমিই করে ফেলেছি। ছয়মাস প্রেম করতে না করতেই বললো বিয়ে করো, বিয়ে করো। করলাম। এখন বলে, আমার বাবা মা কাজের লোকের হাতের রান্না খেতে পারেন না। তুমি হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করলে আমার বাবা মা’কে কে রান্না করে খাওয়াবে?
মুখ ফুটে বলতে পারি না বাবা মা’কে রান্না করে খাওয়ানোর জন্য একজন রন্ধনশিল্পী বিয়ে করতে পারতে। আজকাল অনেক মেয়ে ভিন্ন ভিন্ন রেসিপি ব্যবহার করে চমৎকার সব রান্না-বান্না করতে পারে। রান্না করার জন্য ডাক্তারী পড়া মেয়ের দরকার আছে বলে আমার মনে হয় না।চঞ্চলার সাথে কথা শেষ করে রোদেলা আবার পড়তে বসে।
এবার পহেলা ফালগুনের আগের দিন ভ্যালেন্টাইন ডে পড়েছে। মেডিকেল কলেজের গেইটে বাইশ তেইশ বছরের এক যুবক বেশ কিছুক্ষণ ধরে রোদেলাকে খেয়াল করছিলো। কাছে এসে বললো, আপনি রোদেলা আপু?
জী।
আপনার একটা গিফট আছে।
আমি আপনাকে চিনি না। কেন গিফট নেবো?
আপু একটু এদিকে আসুন, আমি বলছি।
ছেলেটির মুখে সব কথা শুনে অবাক হয়ে যায় রোদেলা। গিফট প্যাকেটটি হাতে নেয়। ছেলেটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় দেয়।
হোস্টেলে এসে প্যাকেটটি খুলে দেখলো, এক গুচ্ছ তাজা গোলাপ। বিভিন্ন রঙের গোলাপ। ‘আজ রোদেলা আকাশ’ ছোট ছোট ফুল দিয়ে লিখে পেচিয়ে দিয়েছে।
অবাক হয়ে যায়। কতটা হিসেব করে তাকে আজকের দিনের জন্য আমেরিকা থেকে ফুল পাঠাতে হয়েছে। এমন রোমান্টিক মনের পরিচয় ক’জন দিতে পারে।
হোস্টেলের বান্ধবীরা অনেক ঠাট্টা করছিলো। খুশীর ফোয়ারা ধরে রাখতে পারছে না। ফুলগুলো পড়ার টেবিলে ফ্লাওয়ার ভাসে রেখে দিলো। আকাশের সাথে অন লাইনে কথা হলো।
আকাশ, তোমাকে ধন্যবাদ জানাবার ভাষা যে হারিয়ে ফেলেছি!
ফুলগুলো তোমার পছন্দ হয়েছে?
এমন নানা রঙের গোলাপ আমার খুব খুব বেশী প্রিয়।
ওর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর গোলাপটির মতোই তুমি সুন্দর।
এমন করে বলছো কেন?
আমার চোখ দিয়ে দেখলে বুঝতে পারতে।
মনে মনে ভাবে রোদেলা, আকাশ তুমিও যে কত সুন্দর লজ্জায় তোমাকে বলতে পারছি না। আমার মেডিকেল কলেজের অনেক হ্যান্ডসাম ছেলেও তোমার পাশে দাঁড়াতে পারবে না।
কি ভাবছো, রোদেলা?
নিজের ভাবনা প্রকাশ করতে সঙ্কোচ হয়। প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলে ফুলগুলোর কথা ভাবছিলাম।
হ্যাঁ, ফুলগুলো ফ্লাওয়ার ভাসে ভিজিয়ে রাখলে একটু বেশী সময় তাজা থাকবে। ওদের উপর অনেক ধকল গেছে।
জানো আকাশ, ফুলগুলো অনেক সুন্দর কিন্তু এত তাড়াতাড়ি ওরা ঝরে যায় কেন?
সুন্দর বলেই তাড়াতাড়ি হারিয়ে যায়। পৃথিবীতে সুন্দরের স্থায়ীত্ব মনে হয় কমই থাকে। আঁধারে ছেঁয়ে থাকে সব রকম সৌন্দর্য।
তুমি আমাকে ফুলের মতো ভালবেসনা। ফুলের জীবনকাল খুব অল্প সময়।
বলে দাও কেমন করে ভালবাসবো?
আমাকে আকাশের মতো ভালবাসবে। সেখানে অনেক উদারতা আছে।
উপরে আকাশ আর নীচে সমুদ্রের বিশালতা দিয়ে তোমাকে আমার বুকের মাঝে আগলে রাখবো।
আকাশ, প্রতিটি মানুষই তার বিশ্বাসের জায়গায় একটুখানি আশ্রয় চায়। আমার মনে হয় সেই জায়গাটা আমি খুঁজে পেয়েছি।
রোদেলার অনেক উচ্ছ্বাস থাকলেও আকাশের মাঝে কেমন যেন নির্লিপ্ততা। আজ দু’জনেই ওয়েব ক্যামেরায় পরস্পরকে দেখছে। আকাশের মুখে বিমর্ষতার ছাপ এড়ায় না রোদেলার চোখে।
কি হয়েছে আকাশ? তোমাকে এমন লাগছে কেন?
কয়েকদিন ধরে শরীরটা ভাল যাচ্ছে না।
কি সমস্যা হচ্ছে?
সব সময়ই জ্বর জ্বর লাগছে। খাওয়া দাওয়ায় কোন রুচি নেই।
একজন ভাল ডাক্তার দেখাও।
হ্যাঁ, গতকাল দেখিয়েছি। কিছু টেস্ট দিয়েছে। দুই একদিনের মধ্যেই রিপোর্ট পেয়ে যাবো।
রোদেলার ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে যায়। মনটা খারাপ হয়। কোন আলাপই আর জমে না। সব কথা যেন এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
আকাশের সাথে তিন দিনেও যোগাযোগ করতে পারে না রোদেলা। পড়ায় মন বসে না। ওর সাথে কথা হলে কেমন যেন প্রাণ ফিরে পায়। ক্লাস শেষ করে বের হওয়ার আগেই মোবাইল চেক করে নেয়। মোবাইলে একটা ম্যাসেজ এসেছে।
রোদেলা, তোমার গল্পটা সত্য হচ্ছে। আমার লিউকোমিয়া ধরা পড়েছে। পাঁচদিন পরে কেমোথেরাপি নেয়া শুরু করবো।
ক্লাস রুমের বাতাস ভারী হয়ে আসছে। প্রশস্ত রুম। তারপরেও ভয়ানক শ্বাসকষ্ট। হেঁটে হোস্টেলে যাওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে রোদেলা। এ কী ম্যাসেজ দেখলো! নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।
অনেক কষ্টে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে কেন্টিনে গিয়ে বসে। সহপাঠীদের হৈচৈ-এর মাঝে বসতে পারছে না। ফিরে আসে হোস্টেলে। অস্বাভাবিকভাবে মাথা ঘুরতে থাকে। পায়ের নীচের মাটি যেন সরে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। মা’কে মোবাইলে জানালো। রোদেলার মা ইসমত আরা স্তম্ভিত! বাকহারা!
রোদেলার বাবা মা দু’জনেই আকাশের ব্যাপারটা জানতেন। আমেরিকা থেকে পড়াশুনা করা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, আবার ওখানেই ভাল চাকরি করছে এমন পাত্রই তো খুঁজছিলেন মেয়ের জন্য। রোদেলা কিংবা আকাশ কারো পরিবারেই এদের বিয়ের ব্যাপারে আপত্তি নেই। শুধু সময়ের অপেক্ষা। রোদেলার ইচ্ছা পড়াশুনা শেষ করে বিয়ে করা। এভাবেই সিদ্ধান্তটা ছিল।
মেয়ের কাছে আকাশের খবর পেয়ে মা হোস্টেলে চলে আসেন। দুই হাতের অঞ্জলিতে মেয়ের মুখ তুলে ধরেন। পরে বুকে জড়িয়ে নিয়ে মেয়েকে সান্ত¦না দেন। রোদেলা নীরব। শুধু দু’চোখ পানিতে ভিজে যায়। আবার নিজেই ওড়না দিয়ে মুছে নেয় চোখ।
রাতে বিছানা থেকে নেমে পায়ে পায়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। রোদেলার পৃথিবীটা দিন দিন বিষাদময় হয়ে যাচ্ছে। দূরে দৃষ্টি ফেলে আঁধারে কী যেন খোঁজে। আকাশের ম্যাসেজ পেয়ে অনলাইনে বসে। কথা হয় আকাশের সাথে। রোদেলা যে মানসিক দিক দিয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বুঝতে বাকী থাকে না আকাশের।
রোদেলা, এমন ভেঙ্গে পড়লে হবে কিভাবে?
প্রচ- ইমোশনে কথা বলতে পারে না রোদেলা।
কথা বলো। তুমি একজন ডাক্তার। রোগকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়াটাই তো তোমার কাজ।
আকাশ, আল্লাহ্ নিজ হাতেই আমাকে শাস্তিটা দিলেন। কেন আমি এমন কল্পনা করতে গেলাম। সৃষ্টিকর্তা আমাকেই আমার গল্পের নায়িকা বানালেন!
এভাবে ভাবছো কেন?
অপরাধবোধ আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। কোন কাজ করতে পারছি না। পড়ার টেবিল আমার কাছে অসহ্য রকম যন্ত্রণাদায়ক হয়ে গেছে।
পড়াশুনা করো মন দিয়ে। তোমাকে একজন বড় ডাক্তার হতে হবে।
আমি সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছি আকাশ।
জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবো সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমি ফেসবুক খুলে প্রথমেই তোমাকে ফ্রেন্ডলিস্টে নিয়েছি। আর জীবনে যতটুকু স্বপ্ন এঁকেছি সেতো তোমাকে নিয়ে। এ জায়গায় অন্য কাউকে ভাবতে পারবো না। কোনদিনই না।
তোমার একটা শূন্যতা হয়তো থাকবে, তারপরেও জীবন জীবনের মতো চলবে।
ডাক্তার বলেই হয়তো আমার বেশী কষ্ট হচ্ছে। বলো, কিভাবে তোমার যন্ত্রণা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবো!
চলার পথে এমন অনেক কঠিন ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এরই নামতো জীবন।
আমাকে যিনি জীবন দিয়েছেন, তাঁর কাছে প্রার্থনা করেছি আমার যতটা আয়ু আছে তার অর্ধেকটা যেন তোমাকে দিয়ে দেন। যতদিন বেঁচে থাকবো দু’জনে একসাথেই বাঁচবো।
আকাশ আজকাল আর আগের মত অনলাইনে বসে না। অফিসও নাকি নিয়মিত করে না। মাঝে মধ্যে মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠায়। কোন ট্র্যাজিক কবিতার লাইন কখনোবা কোন গানের কলি। যেগুলো কাঁদায় রোদেলাকে। আজকে পাঠিয়েছে,
‘জীবনে যদি দ্বীপ জ্বালাতে নাহি পারো, সমাধি পরে মোর জ্বেলে দিও।’ আরেকদিন পাঠিয়েছে,
‘আমিও নদীর মতো হারিয়ে যাবো, আসবো না ফিরে আর আসবো না ফিরে কোনদিন।’
একের পর এক ম্যাসেজগুলো পড়ে রোদেলা।
‘যখন থামবে কোলাহল, ঘুমে নিঝুম চারিদিক।’
‘বুঝবে সেদিন বুঝবে,
   যেদিন আমি হারিয়ে যাবো
   সেদিন আমায় খুঁজবে’
বাকীগুলো আর পড়তে পারে না। দু’চোখ পানিতে ভিজে যায় রোদেলার।
আকাশ, তোমার সাথে আজ কথা বলবো। তুমি অন লাইনে কখন আসবে আমাকে জানিয়ে দাও।
রাত একটার দিকে আকাশ অনলাইনে বসলো। রোদেলা ওয়েব ক্যামেরা অন করলেও আকাশ ওয়েব ক্যামেরা বন্ধ রেখেছে। রোদেলা ওয়েব ক্যামেরা অন করতে বললো।
না রোদেলা। আমার চেহারাটা অসুন্দর হয়ে গেছে। মাথার চুলও অনেক পড়ে গেছে। মুখটা তামাটে হয়ে গেছে। চেহারার মাঝে রুক্ষতা চলে আসছে। আমাকে দেখলে তোমার খারাপ লাগবে। মুখ ঘুরিয়ে নিতে ইচ্ছা করবে। আমরা বরং আগের মতো কথা বলি।
হ্যাঁ, কেমো দেয়ার পরে এমন হয়। তাই বলে আমি তোমাকে দেখবো না এতো হতে পারে না।
এখন যে মন নিয়ে আমার সাথে কথা বললে, আমাকে দেখার পরে সেই মনটা তোমার আর থাকবে না।
আমাকে তুমি আজও চিনতে পারোনি।
আকাশ তুমি এমন এমন ম্যাসেজ কেন পাঠাও!
এক চিলতে হেসে আকাশ বলে, আমার মনের কথাগুলো গুছিয়ে বলতে পারিনা বলে কবি আর গীতিকারের ভাষায় বলি।
আকাশ, তুমি দেশে চলে আসো। আমরা বিয়ে করে ফেলবো।
বোকার মতো কথা বলো না।
না আকাশ। আমি অনেক চিন্তা ভাবনা করেই এ সিদ্ধান্তটা নিয়েছি।
তুমি ডাক্তার। একজন লিউকোমিয়া রোগীর আয়ুস্কাল তুমি জানো?
জানি বলেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি সারাজীবন লাল শাড়ি পরে আমি যতটা সুখ পাবো তার চেয়ে কিছুদিন লাল শাড়ি পরে বাকী জীবন সাদা শাড়ি পড়লে অনেক বেশী আত্মতৃপ্তি পাবো।
এ তোমার ইমোশনাল কথা।
না, এটা আমার সুগভীর চিন্তা-ভাবনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত। এবং তোমাকে এটা মেনে নিতে হবে।
আমার রোদেলা সারাজীবন সাদা শাড়ি পরবে এ আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারবো না।
আমি তোমাকে নিজের মতো করে পেতে চাই। নিয়তি যেক’টা দিন তোমার সাথে আমাকে দেখতে চায় সেই কয়দিনই চাইবো বাকী দিনগুলো আমাদের সুখ স্মৃতি নিয়ে আর মানব সেবা করে কাটিয়ে দেবো। এ কথাগুলো ছেলেরাই বলে মেয়েরা শোনে। কিন্তু আজ আমার বাস্তবতা ভিন্ন।
আমি রাজী রোদেলা। এই ইচ্ছাটা সুপ্ত অবস্থায় থাকলেও প্রকাশ করার সাহস আমার ছিল না। শীঘ্রই আমি দেশে আসবো।
প্রতিবার কেমো নেয়ার আগে রোদেলার কাছে বলে যায়। বিয়ের জন্য কেনাকাটা করা শুরু করে আকাশ। যে মেয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো ডাক্তারী পাশ করার পরে বিয়ে করবে সে নিজেই পাশ করার দুই বছর আগে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলো। বিয়ের প্রতিটা জিনিস কেনার আগে রোদেলাকে নেটে দেখিয়ে নেয়। কোন ব্রান্ডের কসমেটিক্স কিনবে। কি কালার পছন্দ! চমৎকার একটা ডায়মন্ডের সেট কিনেছে। রোদেলা নিষেধ করলেও শোনেনি আকাশ।
রোদেলা বিজনেস ম্যাগনেট বাবার একমাত্র মেধাবী মেয়ে। মেয়ে হিসেবে অতুলনীয়। কিন্তু ভয়ানক জেদী। আকাশেরও জেদ বেশী। গত তিন বছরে কোন কিছু নিয়ে মতানৈক্য হলে এদের কথা বন্ধ থাকতো। কে আগে কথা বলবে? এই ব্যাপারটাই ছিল সমস্যা। যেহেতু পরস্পর পরস্পরকে ভালবাসে এজন্যই কেউ না কেউ কথা বলতো।
নির্দিষ্ট একটা দিনে দেশে চলে এলো আকাশ। প্রথম দেখাটা কোথায় কিভাবে হবে আগে থেকেই পরিকল্পনা করা ছিলো। ওরা গাজীপুরের একটা পিকনিক স্পট বেছে নিয়েছিলো। ঢাকার জনবহুল জায়গাটা ভাল লাগে না রোদেলার। সকাল হতেই ড্রাইভার নিয়ে চলে যায় ওখানে। আকাশের আগেই পৌঁছে যায় রোদেলা।
দীর্ঘ তিন বছর পরে সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির সাথে দেখা। যাকে নিয়ে স্বপ্নের ঘর বেঁধেছে রোদেলা। নিজে নিজে ঠিক করে রেখেছে ভবিষ্যতের চিন্তা করে বর্তমানকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করবে না। নিজের সব হাসি গান দিয়ে ভরিয়ে দেবে আকাশের মন। জীবনের কতটা সময় কল্পনার ডানায় ভর করে দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছে।
বিশ্বাসই হয় না কম্পিউটার মনিটরের সেই মানুষটির সামনে আজ রোদেলা।
আকাশ শুধু তাকিয়ে আছে রোদেলার দিকে। দু’জনই নীরব। আজ যেন কোন কথা নেই শুধু অনুভব। গাছের ছায়ায় বেশ দূরে দূরে দু’জন।
কাছে এসো রোদেলা!
কি করবে ভেবে পাচ্ছে না রোদেলা।
বুঝতে পারছি তোমার লজ্জা লাগছে। ঠিক আছে আমিই আসছি।
রোদেলার একদম পাশে এসে বসে আকাশ। আলতো করে পিঠের উপর হাত রাখে। শরীর কেঁপে ওঠে কী এক শিহরণে। এই প্রথম যেন পাহাড় থেকে ঝর্ণাধারা নেমে আসে।
আমার কাছে সব কিছুই স্বপ্নের মতো লাগছে।
একটু জোরে কাছে টেনে নেয় আকাশ।
স্বপ্ন নয় রোদেলা। আমরা দু’জন অনেক ঘনিষ্ঠভাবে আছি। পৃথিবীর কোন শক্তি আমার কাছ থেকে তোমাকে ছাড়িয়ে নিতে পারবে না। দেখ কত শক্ত করে ধরে রেখেছি। নিজের পকেট থেকে বের করে ডায়মন্ডের রিং রোদেলার অনামিকায় পরিয়ে দেয়। রোদেলার হাতটায় আলতো করে চুমু খায়। নিজের বুকের মাঝে চেপে ধরে রোদেলার হাত।
রোদেলার দু’চোখ পানিতে ভিজে যায়।
এ সময় কাঁদতে নেই রোদেলা। আজ আমাদের এনগেইজমেন্টের দিন।
পাগল হয়ে গেছো তুমি! গাছতলায় কেউ এনগেইজমেন্ট করে?
বিশ্বাস করো এটাই আসল। আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে এনগেইজমেন্ট করা একটা আনুষ্ঠানিকতা। সেখানে তোমাকে এমন করে পেতাম না। পারিবারিক অনুষ্ঠান তাঁদের রীতিনীতিতেই হবে।
রোদেলাই তার মা’র কাছে আকাশকে বিয়ে করার কথা জানায়। রোদেলার বাবা এমদাদ সাহেবের কাছে রোদেলার মা মেয়ের ইচ্ছার কথা জানায়। মেয়ের বিয়ের কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন এমদাদ সাহেব।
কেমন মা হয়েছো তুমি যে একজন অর্ধমৃত ছেলের কাছে মেয়ে দিতে চাইছো?
এটা আমার ইচ্ছা নয়, তোমার মেয়ের ইচ্ছা।
বাংলা সিনেমা দেখে দেখে তোমার মেয়ে নিজেকে নায়িকা বানিয়ে ফেলছে।
এভাবে বলছো কেন?
কিভাবে বলবো? দুই বছর পরে যে মেয়ে ডাক্তার হয়ে বের হবে সে কিনা বিধবার শাড়ি পরার জন্য অপেক্ষা করছে।
ওরা দু’জন দু’জনকে ভালবাসে।
ভালবাসলেই যে বালুচরে ঘর বাঁধতে হবে তা নয়! একজন লিউকোমিয়া রোগীকে দয়া করা যায় তাকে নিয়ে সংসার করা যায় না!
রোদেলাকে আমি বিভিন্নভাবে বুঝিয়েছি। তুমি তো জানো ও ভয়ানক একরোখা মেয়ে।
তোমার মেয়ের এ সিদ্ধান্ত আমি মেনে নিতে পারবো না। আমার কাছে এ ব্যাপারে আর কখনো বলবে না। লেখাপড়া শিখে লোকে সচেতন হয় আর তোমার মেয়ে হয়েছে একটা গন্ডমূর্খ।
বাবা মা রাজী না থাকলেও রোদেলা তা চিন্তা করছে না। সে জানে জীবনটা তার। নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে। কিন্তু ইউ এস এ থেকে আসার পরে বিয়ের ব্যাপারে আকাশ মুখ খোলেনি। কখনো মনে হয়েছে আকাশ বিয়ের ব্যাপারটা ভুলে গিয়েছে। নির্লজ্জের মতো রোদেলা নিজেই একদিন বললো, তুমি তো আমাদের বিয়ের ব্যাপারে কিছুই বলছো না।
আকাশ বললো, এ নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমার উপর ছেড়ে দাও।
ক্লাস শেষে প্রায় প্রতিদিনই দু’জন ঘোরাঘুরি করে। ঢাকার সব দর্শনীয় জায়গাগুলো ঘোরা হয়েছে।
এর মধ্যে রোদেলার বাবা একদিন মোবাইলে মেয়েকে জানিয়ে দেয় আকাশের সাথে যেন সে আর ঘোরাফেরা না করে। রোদেলার মেডিকেল কলেজেরই শিক্ষক ডাঃ আসিফ নেওয়াজ, এফ আর সি এস লন্ডন, তাঁর সাথে বিয়ের কথাবার্তা চলছে।
রোদেলাও বাবাকে জানিয়ে দেয় আকাশকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করা সম্ভব নয়।
রোদেলা, বাবা হয়ে তোকে সাদা শাড়ি পরা দেখতে পারবো না।
বাবা, ছোটবেলা থেকে কারো সাথে প্রতারণা করতে তুমি শিখাওনি।
এটা প্রতারণা নয় বাস্তবতা।
বাবা, আমি তো তোমাদের আগেও বলেছি যতদিন আকাশ বেঁচে থাকবে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে আমি তার পাশে থাকবো।
তুমি যদি সিদ্ধান্তে অটল থাক তাহলে তোমার পথে তুমি, আমরা এর সাথে পাছে নেই। একটাই সান্ত¦না খুঁজে নেবো এমন জেদী মেয়ের বাবা হওয়াটা আমার জীবনে পাপ।
বাবা, তুমি যেভাবে সান্ত¦না খুঁজে নাও আপত্তি নেই।
আমি কি আকাশের সাথে আলাপ করবো? সে একজন শিক্ষিত ছেলে। বুঝিয়ে বললে বুঝবে।
না বাবা। তোমার কাছে মিনতি করে বলছি এই কাজটা করো না।
বাবা মেয়ের মোটামুটি উত্তপ্ত আলোচনা শেষ হওয়ার পরে রোদেলা আকাশকে মোবাইল করে। পরিবারের কোনো সিদ্ধান্তের কথাই জানায় না। মোটামুটি স্বাভাবিক আলাপ-আলোচনা করে।
রাতে রোদেলার মা আবারও মেয়েকে বুঝিয়ে বলেন এমন ছেলে হাত ছাড়া করা উচিত নয়। কিন্তু রোদেলা তার সিদ্ধান্ত থেকে একটুও নড়ে না। রোদেলার মা বলেন, তোমার বাবা বিয়ের ব্যাপারে মোটামুটি পাকা কথা দিয়েছেন।
আমার অমতে?
তোমার বাবার ধারণা বিয়ে হয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। বাবার মান সম্মানের দিকটা তুমি দেখবে বলে তিনি মনে করছেন।
মা আমি তোমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবো না। আকাশ-আমার সম্পর্কটা অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
কলেজ থেকেই ডাঃ আসিফ নেওয়াজের মোবাইল নম্বরটা সংগ্রহ করে রোদেলা। রাতে স্যারের অনুমতি নিয়েই তাঁকে নিজের জীবনের ঘটনাগুলো বলতে থাকে। তাঁকে অনুরোধ করে তিনি নিজেই যেন এই বিয়ে থেকে সরে দাঁড়ান।
ডাঃ সাহেব নাছোড়বান্দা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি রোদেলাকে চেনেন। রোদেলাকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে কল্পনা করে বহুরাত জেগে কাটিয়েছেন। ডাক্তার বলেই যে তাঁর প্রেম ভালোবাসা নেই তা নয়। রোদেলার সাথে কথা বলতে পেরে বেশ রোমাঞ্চিত হচ্ছেন। যদিও রোমান্টিক কোন কথা বলতে তিনি মোটেই অভ্যস্ত নন। রোদেলার সন্দেহ ডাক্তার সাহেব জীবনে কোন উপন্যাস পড়েন নি বা কোন নাটকও শোনেন নি। রোমান্টিক কথা না জানলেও রোদেলাকে আয়ত্তে আনার সব রকম চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছেন। মোবাইল আর ছাড়ছেন না। মহা সমস্যায় পড়ে যায়। অন্য কেউ হলে স্যরি বলে রেখে দিত রোদেলা। সরাসরি স্যার বলে কথা।
আকাশ বার বার মোবাইলে চেষ্টা করে। কিন্তু মোবাইল এনগেইজড। দুই ঘণ্টার বেশী মোবাইল বন্ধ পেয়ে উদ্বিগ্ন আকাশ। রোদেলা স্যারের সাথে কথা শেষ করে দেখলো অনেকগুলো কল এসে রয়েছে। মনে মনে ঠিক করে রেখেছে বিয়ের এই প্রস্তাব আকাশকে জানাবে না। তাহলে আকাশ কষ্ট পাবে। তাড়াতাড়ি আকাশকে কল করলো। বার বার রিং হচ্ছে আকাশ ধরছে না। অস্থির হয়ে যায় রোদেলা। রোদেলা বেশ সেন্টিমেন্টাল মেয়ে। এবার নিজের মোবাইল বন্ধ করে রেখে পরীক্ষার পড়া পড়তে থাকে। মাঝরাতে আকাশ যখন মোবাইলে চেষ্টা করলো তখন রোদেলার মোবাইল বন্ধ। এভাবে শুরু হয় দু’জনার মাঝে ভুল বোঝাবুঝি।
পাঁচদিন পার হয়ে গেল কারো সাথে কোন কথা নেই। কেউ হেরে যেতে রাজী নয়। আকাশই প্রথমে মোবাইল করে। রোদেলার উপর কোন অভিযোগ নেই। এত বড় একটা সময় পার হয়ে গেল মনে হয় কিছুই হয়নি। একদম স্বাভাবিক আলাপ আলোচনা। রোদেলা অভিযোগ করলো এতদিন কেন এমন নীরব থাকলো।
হেসে বললো, স্যরি।
বলো, কি মনে করে মোবাইল করলে?
চলো, কক্সবাজার থেকে ঘুরে আসি।
এখন কেন?
কখন?
বিয়ের পরে যাবো। একবারে হানিমুন করে আসবো।
এখনকার চার্ম তখন থাকবে না।
রোদেলা রাজী হয় না।
রোদেলা তুমি না আমাকে ভালবাস! আমি মরে গেলে আজকের দিনের কথা মনে করে কষ্ট পাবে। তখন শত কাঁদলেও আজকের দিনটা ফিরে পাবে না।
রাজী হয়ে যায় রোদেলা। কক্সবাজারে চলে যায় দু’জন। পাশাপাশি দু’টো রুম ভাড়া নেয়।
কক্সবাজার সী বিচে বসে বলে, কে বলবে তুমি একজন লিউকোমিয়া রোগী!
তুমি আমাকে আগে দেখনি বলে এমন মনে হচ্ছে। আগে আমি অন্যরকম ছিলাম।
রোদেলাকে নিয়ে আকাশ বহুবার কল্পনার সমুদ্রে সাঁতার কেটেছে। আজকে বাস্তব। এখানে কোন স্বপ্ন নেই। তারপরেও দু’জনের কাছেই পুরো ব্যাপারটা স্বপ্ন মনে হয়। বীচ থেকে শামুকের মালা কিনে রোদেলাকে দেয়। অনেক ঘনিষ্ঠভাবে কত শত ছবি তোলে দু’জন। এই দিনের জন্য কত যে প্রতীক্ষা ছিল তাদের। রোদেলার মাঝে অনেকটা জড়তা কাজ করলেও আকাশের কাছে ধরা দেয় না। পাছে আকাশের আনন্দটা সামান্য হলেও ম্লান হতে পারে। রোদেলা তো আকাশকে হাসি গানে ভরিয়ে রাখতে চায়।
কক্সবাজার থেকে এসে আকাশ ওর বোনের বাসায় চলে যায়। রোদেলা ফিরে আসে হোস্টেলে। কোন কারণ ছাড়াই আবারও চার পাঁচদিন কোন খবর নেই আকাশের।
অনেক আগে একবার আকাশের মা’র সাথে কথা হয়েছিলো। রোদেলা ঐ নাম্বারে মোবাইল করলো। সব কিছু খুলে বললো। আকাশের কেমোর খবর জানতে চাইলে তিনি অবাক হয়ে যান। রোদেলা বিস্মিত হয় কিভাবে নিজেকে এতদিন ক্যান্সারের রোগী বলে চালিয়ে নিলো। এমন খল চরিত্রে কেন অভিনয় করলো? সে বলেছিলো মাইক্রোসফ্ট কোম্পানীতে চাকরি করে। কিন্তু আকাশ অন্য ছোট খাট একটা কোম্পানীতে চাকরি করতো। রোদেলাকে প্রায়ই বলতো গাড়ী ড্রাইভ করে বন্ধুকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়ে এলাম। কখনো বলতো, ভাল লাগেনা লং ড্রাইভে যাচ্ছি।
মা বললেন, আকাশ দেশে এসে এবার ড্রাইভিং শিখলো।
রোদেলা বললো, এত মিথ্যা কথা বলার কারণ কি?
আকাশের মা বললেন, আজকালকার ছেলে বন্ধুরা এমন বলে থাকে। তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
আন্টি, আকাশ আমাকে বিয়ে করার জন্য দেশে এলো অথচ একটি বারও বিয়ের প্রসঙ্গ তোলে নি।
বিয়ের প্রসঙ্গ কেন তুলবে? ওতো এক বছর আগেই বিয়ে করেছে!
কি বলছেন আন্টি?
হ্যাঁ ওর স্ত্রীর নাম মাধুরী। একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকরি করে। অফিসিয়াল দূরত্বের কারণে দু’জন দুই বাসায় থাকে। তবে উইক এন্ডে দেখা হয়।
রোদেলার কাছে মনে হলো সমস্ত পৃথিবীটা ঘুরছে। সব কথা কানে পৌঁছায় না। এই পজিশনের একজন মানুষ এতটা প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারে জানা ছিল না। তাহলে কী এই ক’টা বছর একটা মিথ্যার জগতে বসবাস করেছে রোদেলা। এতবড় একজন প্রতারককে কাছে আসার পরেও চিনতে পারলো না! নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হচ্ছে। এমন মিথ্যাবাদীকে ঘৃণা জানাবার ভাষা জানা নেই রোদেলার।
রোদেলা, আকাশের বানানো গল্পগুলো একটার পরে একটা সাজিয়ে তাকে ই-মেইল পাঠায়।
রোদেলার ই-মেইলের পর পরই আকাশ মোবাইল করে।
তুমি মিথ্যাবাদী আকাশ! কেন তুমি আমার সাথে এই অভিনয়টা করলে?
সত্যি বললে বিশ্বাস করবে?
বিশ্বাস করবো কি করবো না জানি না। চাইলে বলতে পারো।
তুমি বলেছিলে ডাক্তারী পাশ করার পরে বিয়ে করবে। আমার অতটা ধৈর্য ছিল না। এ ছাড়াও আমি পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম তুমি আমাকে কতটা ভালবাস!
আমি আমার পরীক্ষায় পাশ করলেও তুমি কিন্তু হেরে গেলে।
এবার তো জেনে গেলে আমি ক্যান্সারের রোগী নই। বলো কবে আমরা বিয়ে করবো।
তোমার নাটক এখনও শেষ হয়নি? আর যাই হোক প্রতারণা করে ঘর বাঁধা যায় না। ছোটবেলা থেকে মিথ্যাকে আশ্রয় করতে শিখিনি। আমি ইট পাথরের ঘর বাঁধতে চাইনি। বালুচরে ঘর বাঁধতে চেয়েছিলাম। আমাদের ভালোবাসার মর্যাদা দেয়ার জন্য বাবা মা’র পছন্দের পাত্র এফ আর সি এস ডাক্তার আসিফ নেওয়াজ স্যারের মতো পাত্রকে প্রত্যাখ্যান করেছি। আজ এখানেই তোমার সাথে আমার সম্পর্ক শেষ। তুমিতো জানোই আমি ভয়ানক রকম একরোখা একটা মেয়ে। আমার সাথে গভীর সম্পর্ক বজায় রেখে তুমি বিয়ে করেছো। আমি তোমাকে যুক্তি দিয়ে কখনো বিচার করিনি মন দিয়ে বিচার করেছি। স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তুমি দিনের পর দিন আমার সাথে প্রেমের অভিনয় করেছো। নাটকের শেষ দৃশ্যে তুমি অবস্থান করছো। একটা সহজ সরল মেয়ের হৃদয় নিয়ে কী এক পৈশাচিক আনন্দে মেতেছিলে তুমি! কখনো আমাকে অনেক রঙিন স্বপ্ন দেখিয়েছো। আবার অকাল বৈধব্যকে মেনে নেয়ার মতো বাস্তবতাকে কষ্টি পাথরে যাচাই করে নিয়েছো। খেলার ছলে তুমি আমার ভেতরের আমিকে কতটা ক্ষত বিক্ষত করেছো জানো না। গত তিন তিনটা মাস মানসিক অসহ্য যন্ত্রণা দিয়ে তুমি আমার ভালোবাসার পরীক্ষা নিয়েছো। কি বিকৃত তোমার ভালোবাসা! বিদায় আকাশ। বিদায় আমার ভালোবাসা। ভাল থেক।
আকাশের দেয়া ডায়মন্ডের রিংটা তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেয় রোদেলা।
বহুবার মোবাইল করেছে আকাশ কিন্তু রোদেলা ধরেনি।
কয়েকদিন পরে একটা এস এম এস আসলো। “রোদেলা, শেষ দেখাটা হলো না। আমি আমেরিকায় ফিরে গেলাম।”
বেশ কিছুদিন পরে রোদেলার মোবাইলে বিভিন্ন রকম বাজে ম্যাসেজ আসতে শুরু করলো। একই ম্যাসেজ ডাঃ আসিফ নেওয়াজের মোবাইলেও আসলো। মানসিক যন্ত্রণায় পাগলপ্রায় হয়ে যায় রোদেলা।
একদিন ক্লাস শেষে সহপাঠী আনান রোদেলাকে ডেকে বললো, ইন্টারনেটে কেউ একজন রোদেলার কিছু আপত্তিকর ছবি এবং ভিডিও আপলোড করেছে। নেটে আকাশের সাথে নিজের আপত্তিকর ভিডিও দেখে থমকে যায় রোদেলা। হোস্টেলে বান্ধবীদের সামনে ভীষণ অস্বস্তিতে থাকায় বাসায় চলে আসে। বাসার সবাই যে ইতিমধ্যেই এ খবর পেয়ে গেছে তা স্পষ্ট। এতদিন মোবাইলে পাওয়া এস এম এসগুলো বাসায় জানায় নি রোদেলা। বাবা এমদাদ সাহেব খুব গম্ভীরভাবে মেয়েকে বললেন, চল থানায় যেতে হবে।
কেন বাবা?
জি ডি করতে হবে।
রোদেলা একটা পাথরের মূর্তি হয়ে গেল। তার শরীর, মন, বুদ্ধি কিছুই যেন কাজ করছে না। বাবার সাথে থানায় গেল। ওসি সাহেব একের পর এক প্রশ্ন করে করে স্বীকার উক্তি করালো যে সে আকাশের সাথে অবৈধভাবে বিভিন্ন সময়ে মিশেছে।
বাসায় ফেরার পরে এমদাদ সাহেব খাটে শুয়ে গড়াগড়ি দিয়ে হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগলেন। যত রকম অশ্রাব্য ভাষা আছে সেগুলো ব্যবহার করে  নিজের আদরের তনয়াকে গালাগালি দিতে লাগলেন। এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। রোদেলার মা এসে মেয়েকে বললেন, তোর বাবা কেমন যেন করছে। প্রেসারটা মেপে দেখ।
রোদেলা প্রেসার মাপার মেশিন নিয়ে বাবার কাছে যেতেই চিৎকার করে বললেন, খবরদার তুমি ছোবে না আমাকে। নোংরা মেয়ে। আমার বংশের কলঙ্ক। এ জানলে জন্মের পর পরই তোমাকে গলা টিপে মেরে ফেলতাম। লোকজনের কাছে কিভাবে আমি মুখ দেখাবো!
রোদেলা নিজ রুমে গিয়ে শিশুর মতো চিৎকার করে কাঁদে। তাতেও যেন নিজেকে হালকা করতে পারে না। খাওয়া দাওয়া ঘুম সব কিছুই ত্যাগ হয়ে যায় কিছুদিনের জন্য। পরিবারের সবার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রোদেলাকে কখনও খাবার টেবিলে ডাকা হয় না। ঘরের কেউ রোদেলার সাথে কথা বলে না। খুব প্রয়োজনে মা দু’একটি কথা বলে। সারাদিন নিজের রুমের মধ্যে দরজা বন্ধ করে থাকে। কখনো মনে হয় আত্মহত্যা করতে। কিন্তু আত্মহত্যা তো কোন সমাধান নয়। নিজে নিজেই একটা শক্তি অর্জন করে, ব্যক্তিগত জীবন না-ই বা থাকলো। দিন রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে নিজে যে জ্ঞানটুকু অর্জন করেছে সেটুকু দিয়ে মানুষের যতটুকু খেদমত করতে পারে এটাই স্বপ্ন। ডাক্তারী পেশায় নিজেকে সমর্পণ করে যেন মানুষের সেবা করতে পারে।
তিনটা বছর পার হয়ে গেছে। রোদেলা সরকারি হসপিটালে চাকরি পেয়েছে। সরকারি কোয়ার্টারে থাকে। ছকে বাঁধা জীবন। সকালে হসপিটাল। বিকেলে প্রাইভেট প্রাকটিস। আকাশ নামের একটা প্রতিবিম্ব সারাক্ষণই যেন অনুসরণ করে রোদেলাকে। ডাঃ আসিফ নেওয়াজ রোদেলাকে বিয়ে করার চিন্তা অনেক আগেই পরিহার করেছেন। তিনি রোদেলাকে ম্যাসেজ পাঠিয়েছিলেন, তোমার মতো মেয়ের এমন ভিডিও চিত্র দেখে মেয়েদের প্রতি আমার ঘৃণা এসে গেছে। বিয়ে করার স্বপ্ন আমার হারিয়ে গেছে।
শত ক্লান্তির পরে যখন একটু সময় পায় আকাশের কথা মনে হয়। তারপরেও ক্ষীণ আশা কোনদিন কোন ক্ষণে যদি আকাশ মোবাইলে বলে, রোদেলা আমার ভুল হয়ে গেছে আমাকে ক্ষমা করো। হয়তো ক্ষমা করে দেবে রোদেলা। জীবনের চলার পথে যদি কখনো দেখা হয়, আকাশকে বলবে আমি তোমাকে ভালবেসেছিলাম। রোদেলার অন্য সত্তাটি বলে, আকাশ তুমি কী মানুষ? তোমার প্রিয় মানুষটিকে হিংস্র থাবায় ক্ষত বিক্ষত রক্তাক্ত করে উন্মুক্ত করে দিয়েছো এই সুন্দর পৃথিবীর বুকে! এর নাম যদি প্রেম হয় তবে অচিরেই পৃথিবীর বুক থেকে প্রেম হারিয়ে যাবে। প্রেম কাকে বলে মানুষ শুধু সিনেমা, নাটক আর উপন্যাসের পাতায় জানতে পারবে। তবে নতুন করে সৃষ্টি হবে না কোন উপন্যাস কিংবা কোন কবিতা। ছলনা করার অনেক মাধ্যম আছে। সেখানে মানুষের সরল একটা মনের সাথে কেন?
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার আন্দিউরা ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামের গৃহবধূ ফেরদৌসী আক্তারের স্বামী আড়াই বছর ধরে দুবাই প্রবাসী। চার সন্তান নিয়ে তাঁকে নাজুক দিনযাপন করতে হয়েছে। এই নারীর বিরুদ্ধে গ্রামের লোকজন অবৈধ সম্পর্কের অভিযোগ তুলে তাঁকে সালিশের মাধ্যমে জনসমক্ষে কান ধরে ওঠবস করিয়েছেন। চারটি সন্তান নিয়েই ট্রেনের নীচে ঝাঁপ দিয়ে অপমান, ক্ষোভ আর অসহায়ত্বের এক নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছেন। দু’টি    সন্তান আশঙ্কাজনক অবস্থায় বেঁচে গেলেও বাকি দুই সন্তানসহ ফেরদৌসী আক্তার প্রাণ দিলেন। জাতীয় সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে সংবাদটি। যে সালিশে ফেরদৌসী আক্তারকে কান ধরে ওঠবস করানো হয়েছে, এর সভাপতি ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়্যারমান। আমরা প্রতিদিনের খবরের কাগজে নারীদের প্রতি সহিংসতা দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এই সব কর্তা ব্যক্তিদের যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হতো তাহলে নিশ্চয়ই এ ধরনের ঘৃণিত কাজ আর কেউ করতে সাহস পেত না। একবিংশ শতাব্দীতেও নারীরা সেই জায়গায়ই রয়ে গেছে। কবে এঁদের মুক্তি হবে? নারী মুক্তির জন্য আর কত নারী, শিশুকে এভাবে প্রাণ দিতে হবে? মোবাইল ইন্টারনেটের এত সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যেও এতবড় একটা বর্বর সিদ্ধান্ত অসহায় এক নারীর উপর চাপিয়ে দেয়া হলো। বলতে কষ্ট হয় আমরা স্বাধীন দেশে বাস করছি। স্বাধীনতাটা কী শুধু পুরুষের অর্জন? স্বাধীনতা যুদ্ধে কী নারীরা যুদ্ধ করেনি? নারী কী তাঁর সম্ভ্রম হারায় নি? নারীর সিঁথির সিঁদুর কী মুছে যায় নি? মা কি সন্তানহারা হয় নি? বোন কি ভাই হারা হয় নি? এ প্রশ্ন জাতির বিবেকের কাছে! এমন দিন কী কোনদিন আসবে যেদিন খবরের কাগজে কোন নারী নির্যাতনের খবর ছাপা হবে না। সাংবাদিকরা হন্যে হয়েও কোন নারী শিশু নির্যাতনের তথ্য পাবে না। দেশ থেকে নারী নির্যাতন উঠে যাবে!
খবরের কাগজ পড়ে চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যায় রোদেলার। মনে মনে ভাবে ফেরদৌসী আক্তার মরে বেঁচে গেছেন, আর আমি বেঁচে থেকেও মৃত। লোকের পিট পিট করে তাকানো, ঠোটে বাঁকা হাসি প্রতিদিন আহত করে রোদেলাকে। রোদেলা জানে হাজারো বাঙালি নারী এই নির্যাতনের শিকার। কোথাও অভিযোগ জানাতে হলে নিজেকে যে কতটা নগ্নভাবে উপস্থাপন করতে হয় রোদেলা জানে। এতটা লজ্জা হজম করার শক্তিতো সব মেয়ে অর্জন করতে পারেনি। তথাকথিত সেই সমাজের দিকে পেছন ফিরিয়ে সামনে চলতে শিখেছে রোদেলা। শরীরের রোগ সারানোর ডাক্তারীবিদ্যা অর্জন করেছে রোদেলা। কিন্তু এই ঘুণে ধরা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে ক্যান্সারের জীবাণু ঢুকে আছে কী দিয়ে সারাবে রোদেলা। এটা কারো একার কাজ নয়। জনমত সৃষ্টি করতে হবে। রোদেলা নিজের পেশার পাশাপাশি এমন একটা কাজ করতে চায় যেন প্রতিটি নারী স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা পায়I

Related posts

বয়সকে তুড়ি মেরে যৌবনে তিন অভিনেত্রী

Irani Biswash

প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ডের গভর্নর জেনারেল হলেন মাওরি নারী

Mims 24 : Powered by information

 কওমি মাদরাসাগুলোকে বর্তমান শিক্ষা উপযোগী করতে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন

Irani Biswash

Leave a Comment

Translate »