এই মাত্র জাতীয় ব্রেকিং

নৌকার কেন বিপর্যয় ইউপি ভোটে?

প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ১ হাজার ১৯৮ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা দলীয় বিদ্রোহী, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলের প্রার্থীদের কাছে ৪২৪ ইউপিতে পরাজিত হয়েছেন। অনেক ইউপিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জামানতও হারিয়েছেন। ১৩১ ইউপিতে প্রতিযোগিতা করতে পারেননি, এমনকি দ্বিতীয়-তৃতীয় অবস্থানেও ছিলেন না আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। দ্বিতীয় ধাপে সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে ৮৯.৭৬ শতাংশ। সর্বনিম্ন ভোট পড়েছে ৪২.২৮ শতাংশ। গড় ভোট পড়েছে ৭৩.৪৯ শতাংশ। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইউপির দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশই পরাজিত হয়েছেন। যদিও প্রথম ধাপের ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা ৭৩.৪৮ শতাংশ বিজয়ী হয়েছিলেন। আর ওই ধাপে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছিলেন ২৪.২২ শতাংশ ইউপিতে।দুই ধাপের ভোটে ৪২৪ ইউপিতে নৌকার কেন বিপর্যয়, সেই হিসাব-নিকাশ করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলের হাইকমান্ড বিদ্রোহীদের কাছে নৌকা প্রতীকের পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণ করছেন। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, বিদ্রোহী দমনে আওয়ামী লীগ অ্যাকশনে যাচ্ছে। তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিষ্কার করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় ধাপের পরাজয় নিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের আগামী সভায় বিস্তারিত আলোচনা হবে।

ইসি সূত্র জানিয়েছে, দুই ধাপের ভোটে ২০ ইউপিতে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক ছিল না। এসব ইউপিতে দলীয় মনোনয়ন উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল। সেই হিসাবে দুই ধাপের ১ হাজার ১৯৮ ইউপি ভোটে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে ১ হাজার ১৭৮ জন প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এর মধ্যে জয় পেয়েছেন ৭৫৪ জন তথা ৭৫৪ ইউপিতে। অন্য প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন ৪৪৪ ইউপিতে। তবে ২০ ইউপিতে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন না দেওয়ায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিদ্রোহী ও অন্য দলের প্রার্থীর কাছে হেরেছেন ৪২৪ ইউপিতে। নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি থাকায় ভোট ভাগাভাগি হয়েছে। দলীয় বিশৃঙ্খলা, মনোনয়ন বাছাইয়ে দুর্বলতা ও সংসদ সদস্যদের নৌকার বিরোধিতার কারণে অনেক এলাকায় নৌকা হেরে গেছে। ইউপি ভোটে দিন দিন আওয়ামী লীগের ভোট কমছে। বলা চলে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে এবার দ্বিতীয়বারের মতো ইউপি চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হচ্ছে। বিএনপি এ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী দেয়নি। জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দলের অংশগ্রহণও অনেকটা নামমাত্র। মাঠে বড় দল হিসেবে আওয়ামী লীগ একাই। আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এবং এ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যেই নির্বাচনে মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। তারাই নির্বাচনে সহিংসতার ঘটনা ঘটাচ্ছেন। নির্বাচন বিশ্লেষক ও সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, মনোনয়ন বাণিজ্য তথা টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। বিতর্কিতদের মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। অনেক প্রার্থী প্রভাব বিস্তার করে দলীয় মনোনয়ন নিচ্ছেন। এসব কারণে যোগ্য ও সঠিক ব্যক্তিরা স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাচ্ছেন না। তাই ভোটারদের প্রার্থী পছন্দ না হওয়ার কারণেই অনেক ক্ষেত্রে নৌকার প্রার্থীকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উচ্ছৃঙ্খলতা এবং সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ডে সাধারণ মানুষ বিরক্ত হচ্ছে। সেসব কারণেও ভোটাররা সুযোগ পেলেই নৌকা প্রত্যাখ্যান করছে। ইসি জানিয়েছে, গত ১১ নভেম্বরের দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থীদের ৫৮.২৭ শতাংশ জয়ী হয়েছেন। বাকি ৪১.৭৩ শতাংশ নৌকার প্রার্থী নিজ দলের বিদ্রোহী, স্বতন্ত্র (বিএনপি), অন্যান্য দলের প্রার্থীদের কাছে পরাজিত হয়েছেন। এ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন ৩৯.৫৬ শতাংশ। তাদের মধ্যে বিএনপি-জামায়াত নেতারাও আছেন।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রথম ধাপের তুলনায় দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের ভোট কমেছে। দ্বিতীয় ধাপের ৮৩৩টি ইউপির মধ্যে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন ৪৮৫টিতে। এর মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৮১ জন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৪০৪ জন জয়ী হন। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন ৩৩০টিতে। এ ছাড়া এই ধাপে জাতীয় পার্টি ১০টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ চারটি এবং জাতীয় পার্টি (জেপি), খেলাফত মজলিশ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি একটি করে ইউপিতে জয়ী হয়েছে। প্রথম ধাপে গত ২১ জুন ও ২০ সেপ্টেম্বরের ভোটে নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা ৭৩.৪৮ শতাংশ ইউপিতে জয়ী হন। অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছিলেন ২৪.২২ শতাংশ ইউপিতে। ওই নির্বাচনে ৩৬৫টি ইউপির মধ্যে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা ২৬৯টিতে জয়ী হন। এর মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৭২টি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৯৭টিতে জয়ী হন। অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হন ৮৮টি ইউপিতে। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি তিনটি, জাতীয় পার্টি (জেপি) তিনটি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি একটি করে ইউপিতে জয়ী হয়। ২০১৬ সালের চিত্র : পাঁচ বছর আগে ২০১৬ সালে প্রথম দলীয়ভাবে ইউপি ভোট হয়। তাতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাপাসহ অনেক দল অংশ নেয়। সেবার ছয় ধাপের ভোট হয়। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, প্রথম ধাপে ৭৪ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে ৭৮ শতাংশ, তৃতীয় ধাপে ৭৬ শতাংশ, চতুর্থ ধাপে ৭৭ শতাংশ, পঞ্চম ধাপে ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ ও ষষ্ঠ ধাপে ৭৬ শতাংশ ভোট পড়ে। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ৪৭ দশমিক ২৭ শতাংশ, বিএনপি ১৮ দশমিক ৮১ শতাংশ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ২৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। নির্বাচনে নৌকা প্রতীক জয় পায় ২ হাজার ৬৭০ ইউপিতে, বিএনপি ৩৭২ ইউপিতে আর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৮৮০ ইউপিতে। বাকিগুলোয় রয়েছেন জাতীয় পার্টি, জাসদ, জেপি ও কয়েকটি দলের প্রার্থী।

Related posts

কুষ্টিয়ায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ৪

razzak

ইউক্রেন সীমান্তে রুশ সেনার সংখ্যা বেড়ে ১ লাখ ৯০ হাজার

razzak

তিন মাসে পাঁচ রুশ ধনকুবেরের আত্মহত্যা: রিপোর্ট

razzak

Leave a Comment

Translate »