অপরাধ অভিমত আন্তর্জাতিক এই মাত্র এই মাত্র পাওয়া জাতীয় জীবনধারা বাংলাদেশ ব্রেকিং ব্রেকিং নিউজ

১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ গণহত্যা

ফরিদ আহমদ, নিউজিল্যান্ড

২০১৯ সালের ১৫ মার্চ, শুক্রবার নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায়ের লক্ষ্যে আমি ও আমার স্ত্রী হাজির হই। ১৯৯৮ সালে একটি মারাত্মক দূর্ঘটনার পর থেকে আমি হুইল চেয়ারে চলাফেরা করি এবং তখন থেকেই আমার স্ত্রী আমার তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত ছিল। ঐ দিনে আমাদের পরিকল্পনা ছিল জুম্মার নামাজ শেষে আমরা আমাদের একমাত্র মেয়েকে স্কুল থেকে বাসায় নিয়ে যাবো। সেটি ছিল আমাদের পরিকল্পনা কিন্তু আমরা ঘুনাক্ষরেও ভাবতে পারিনি যে আমাদের জন্য লেখা ছিল ভিন্ন পরিকল্পনা।

আমরা কখনো কল্পনাও করিনি যে সশস্ত্র বন্দুকধারী মসজিদে ঢুকে শান্তিপ্রিয় নামাজীদের ওপর গুলি করবে, ভাবিনি ৫১ জন লোকের শাহাদৎ বরণ করতে হবে, ভাবিনি পবিত্র নামাজীদের রক্তে রঞ্জিত হবে পবিত্র মসজিদ, ভাবিনি যে আহত ও নিহতদের বেদনায় বিরহী হবে পারিপার্শ্বিক জগৎ এবং এও কল্পনাও করিনি যে আমার প্রিয়তম স্ত্রী আর কখনো ফিরে আসবে না বরং শরিক হবে শহীদদের মিছিলে। সেদিন ভাবিনি আমার আদরের মেয়ে চিরতরে হারাবে তাঁর স্নেহময়ী মা’কে। ভাবিনি আরো অনেক সন্তান হারাবে পিতা-মাতা-ভাই-বোনকে, ভাবিনি নারী তাঁর স্বামী হারিয়ে বিধবার বিরহী ভূষণে আবদ্ধ হবেন।

আজ ২০২৩ সালের ১৫ মার্চ। দীর্ঘ এ চার বছরে শুকিয়েছে রক্ত কিন্তু শুকায়নি আমাদের হৃদয়ের গভীর ক্ষত। এখনো শুকিয়ে যায়নি চোখের অশ্রু। আমরা ভুলিনি সেদিনের বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা ও স্বজন হারানোর ব্যথা। ভুলিনি শহীদানের জন্য আমাদের হৃদয়ের আর্তনাদ অব্যাহত রাখতে, এবং ভুলিনি তাদের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়ার দরখাস্ত করতে। এই আর্তনাদ ও দোয়ায় সেদিন অংশ নিয়েছিলেন বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়। আমরা আজও তাদের দোয়া ও ভালোবাসাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি, যেমন স্মরণ করি আমাদের শহীদান, আহত ও জীবিত ভুক্তভোগী ভাইবোনদের। এর পাশাপাশি আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি আমাদের মানবজাতি ভাইবোনদের যারা ধর্ম, বর্ণ  ও জাতি নির্বিশেষে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, অবস্থান নিয়েছিলেন হিংসা-বিদ্বেষ ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে।

সেদিন শহীদানের তালিকায় আমি অন্তৰ্ভূক্ত হতে পারিনি তবে আল্লাহ পাক আমাকে ১৫ মার্চ তান্ডবলীলার অনেকটা দেখার সুযোগ দিয়েছিলেন। আমার দেখা অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়াকে আমি বিলীন কিংবা নষ্ট হতে দেইনি। আর তাই ১৫ মার্চ হত্যাকাণ্ডের ৪র্থ দিন থেকেই আমি কলাম লেখা শুরু করি যা আজও অব্যাহত আছে। হত্যাকাণ্ডের এক বছর পর ৪ মার্চ ২০২০ সালে প্রকাশিত হয় আমার লেখা প্রথম বই। বহুল সমাদৃত বইটির নাম “Husna’s History, my wife, the Christchurch Massacre and my journey to forgiveness” । বইটির অডিও ভার্সনও প্রকাশিত হয়েছে।

১৫ মার্চের গণহত্যা থেকে অনেক কিছু শিক্ষার আছে, যেমন মানবতার যেকোনো বিপর্যয়ে সবার এগিয়ে আসা। এ ঘটনায় আবারো প্রমাণিত হয়েছে সন্ত্রাসীর কোনো ধর্ম নেই, বর্ণ কিংবা জাত-পাত নেই, সে সন্ত্রাসীই। ১৫ মার্চের নৃশংসতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশ্ব মানব বিবেক জাগ্রত হোক, মানুষে মানুষে ঘৃণা দূর হোক, মানুষ মানুষকে ভালোবাসুক, পারস্পরিক যেকোনো বিভেদ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের পথ বেছে নিক এবং মানুষ মানুষকে হত্যার পরিবর্তে পরস্পরকে বাঁচাতে সক্রিয় হোক, এটাই আমার প্রত্যাশা।

ফরিদ আহমদ
লেখক, গবেষক, বক্তা, প্রবাসী বাংলাদেশী
১৫ মার্চ ২০১৯ এ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদ হত্যাকাণ্ডে বেঁচে যাওয়া ভুক্তভোগী

Related posts

বিশ্বকাপে উঠতে রোনালদোদের অগ্নিপরীক্ষা

razzak

সপ্তাহটি কেমন যাবে ১২ রাশির জাতক জাতিকার

Irani Biswash

রাফিনহা-নেইমারের ঝলকে জয়ে ফিরল ব্রাজিল

razzak

Leave a Comment

Translate »