আন্তর্জাতিক এই মাত্র এই মাত্র পাওয়া জীবনধারা ধর্ম ও জীবন প্রবাস কথা বাংলাদেশ ব্রেকিং ব্রেকিং নিউজ শিক্ষা সম্পাদকীয়

মহাপূণ‍্য মহালয়া ও দেবীপক্ষ তিথি: অনুষ্ঠান ও ভাবনা!

আশ্বিন মাসের প্রথম লগ্নে শারদ প্রাতে পিতৃপক্ষের সমাপণে দেবীপক্ষের সূচনা। শারদ শুভ্র আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষকে বলা হয় পিতৃপক্ষ এবং এর শেষদিন বা তিথি হচ্ছে মহালয়া তিথি। তাই এই পূণ‍‍্য তিথি কৃষ্ণপক্ষের পুরো  সময়কেও মহালয়া বলা হয়। দেবীপক্ষের সূচনার পূর্ব পর্যন্ত এই মহাক্ষণকে বলা হয় মহালয়া। শাস্ত্রমতে মহালয়া হচ্ছে একটি অমাবস্যা তিথি বা কৃষ্ণপক্ষ। এ তিথিতে সাধারণত পিতৃপুরুষেদের উদ্দ‍েশ‍্যে শ্রাদ্ধ, তর্পণ ও অঞ্জলি প্রদান করা হয়। শাস্ত্র অনুসারে এ দিন তর্পণ করলে পিতৃপুরুষরা নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে স্বর্গলোকে    গমন করেন এবং আমাদের আর্শিবাদ প্রদান করেন। তাছাড়া মহালয়া তিথি শেষে দেবীপক্ষের সূচনায় দেবী দুর্গার বোধন করা হয়। বোধন অর্থ জাগরণ। কারণ শ্রাবণ মাস থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত দক্ষিণায়ন অর্থাৎ দেবলোকে রাত্রি। আমাদের ছয় মাস সমান দেবলোকের একদিন। তাই দেবীপক্ষের এই পূণ‍্য তিথিতে দেবী দুর্গাকে বোধন বা জাগরণের মহাআয়োজনের অধ‍্যায়কেও মহালয়া বলে অভিহিত করা হয়। যদিও তখন মহালয়া তিথির সমাপ্তি ঘটে দেবীপক্ষ তিথি শুরুর মধ‍্য দিয়ে। এভাবেই এর প্রচলন হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। মূলত দেবীর জাগরণ মহালয়ার শেষে দেবীপক্ষের সূচনায়। ঘুমন্ত দেবীকে অকালে জাগরণ তথা বোধন করতে বাধ‍্য        হয়েছিলেন লংকা বিজয়ের সময় রাবণ বধের জন‍্য অযোধ‍্যা নরেশ শ্রীরাম চন্দ্র। সীতা দেবীকে উদ্ধারের জন‍্য নিরুপায় শ্রী রাম দুর্গা দেবীর আশির্বাদ প্রত‍্যশায় বাধ‍্য হয়েই দেবীর অকাল বোধন করেন। কারণ শ্রী রামের   পক্ষে সীতা দেবীকে উদ্ধারের জন‍্য উত্তরায়ণ পর্যন্ত অপেক্ষা করা অসম্ভব ছিল। শ্রীরামের একাগ্রতা, ভক্তি, নিষ্ঠা ও মনুষ‍্য জন্মের সংস্কার পালনের প্রতি শ্রদ্ধা অবলোকন করে দেবী দুর্গা অতি প্রসন্ন হয়ে তাঁকে রাবণ বধ ও লংকা বিজয়ে দেবী সীতার উদ্ধারের আশির্বাদ প্রদান করেন। সেই থেকে অকাল বোধনে দেবী দুর্গাকে জাগিয়ে পূজার আয়োজন প্রচলিত। শ্রীরামের এই পূজাকে জগৎ সংসারে বরেণ‍্য করে রাখার জন‍্য দেবী এই পূজাকে চিরকাল ব‍্যাপী স্বীকার করেন বিধায় আজও অকাল বোধনে দেবীর পূজা প্রচলিত। মূল পূজা হয় বসন্তে অর্থাৎ উত্তরায়নে যখন দেবলোকে দিন তখন। যাকে বাসন্তী পূজা বলা হয়। তাই শ্রীদুর্গার আরেক নাম বাসন্তী।

তাহলে এই মহালয়া তিথির সাথে দু'টি বিষয় যুক্ত। একটি হচ্ছে বেদনায়, ভালোবাসায় ও শ্রদ্ধায় পিতৃপুরুষদের স্মরণ করে তিল জলের তর্পন, অঞ্জলি প্রদান ও বিভিন্ন পার্বনের আয়োজন করা হয় পিতৃপক্ষের এই পূণ‍্যতিথি মহালয়ায়। আর এই মহালয়ার শেষ ও দেবীপক্ষের সূচনায় দেবী দুর্গার বোধন বা পূণ‍্য জাগরণের আয়োজন করা হয়।

এই মহালয়া তিথিতে যারা পিতৃ-মাতৃহীন তাঁরা তাঁদের পিতা মাতা ও পূর্বপূরুষদের স্মরণ করে তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করে গঙ্গায় তিল ও জলে অঞ্জলি প্রদান করেন। সনাতন ধর্ম অনুসারে এই পিতৃপক্ষে প্রয়াতদের আত্মা মর্ত্যে আসেন তাঁদের সন্তান সন্ততির হাতে অঞ্জলি গ্রহণ করতে এবং তাঁদের উত্তরসুরীদের আশির্বাদ করতে। এইসব পবিত্র আত্মা এক পক্ষকাল ব‍্যাপী মর্ত‍্যে অবস্হান করেন। প্রয়াতদের পবিত্র আত্মার মর্ত‍্যে আগমনের এই সমাবেশকেও বলা হয় মহালয়া। মহালয় তথা অমৃতলোক থেকে পূণ‍্যাত্মাদের আগমনই হচ্ছে মহালয়া। এটি পিতৃপক্ষেরও শেষদিন বা তিথি।

সনাতন ধর্ম অনুসারে বছরে একবার পিতা-মাতার উদ্দেশ্যে পিন্ড দান করতে হয়। সেই তিথিতে করতে হয় যে তিথিতে তাঁরা প্রয়াত হয়েছেন। সনাতন ধর্মের কার্যাদি কোন তারিখ অনুসারে করা হয় না। তিথি অনুসারে হয়। বৈদিক পঞ্জিকা অনুযায়ী, একটি চান্দ্র দিনকে তিথি বলে। চাঁদ ও সূর্যের মধ্যে ১২ ডিগ্রি দ্রাঘিমাকোণ বৃদ্ধির    সময়কে একটি তিথির সময়কাল ধরা হয়। তিথির সূচনার সময় দিন অনুযায়ী বদল হয় এবং তিথির মোট     সময়কাল ১৯ ঘণ্টা থেকে ২৬ ঘণ্টার মধ্যে হয়ে থাকে। এই মহালয়া তিথিতে সব পিতৃপুরুষ, বন্ধু-বান্ধব,    আত্মীয়,     অনাত্মীয় এবং যাদের  উদ্দ‍্যেশ‍্যে অঞ্জলি দেবার মত সন্তান সন্ততি নেই তাঁদের উদ্দেশ্যেও অঞ্জলি প্রদান করা  হয়। এমনকি বিশ্বব্রহ্মান্ড, গ্রহ, নক্ষত্র, প্রকৃতির উৎকর্ষ, বিকাশ ও শান্তির জন‍্য তর্পন করা হয়। তাছাড়া দেব, দক্ষ, গন্ধর্ব, অপ্সরা, গরুড়, পক্ষীকূল, বিদ‍্যাধর, কিন্নরসহ ধর্মকার্য‍্যে রত জীবকূলের উদ্দেশ্যে অঞ্জলি প্রদান করা হয়। এমনকি পাপকার্য‍্যে লিপ্ত প্রাণীর সদবুদ্ধি জাগরণের জন‍্যও অঞ্জলি প্রদান করা হয়।  অর্থাৎ মহালয়াতে যারা গঙ্গায় অঞ্জলি প্রদান করেন পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তির জন্য, তাঁরা শুধু পূর্বপুরুষদের নয়; পৃথিবীর    সমগ্র সত্ত্বার জন্য প্রার্থনা ও অঞ্জলি প্রদান করেন। এই হচ্ছে সনাতন ধর্মে মহালয়ার তাৎপর্য।

এই বিশ্বব্রহ্মান্ড, প্রকৃতি, সুর্য, চন্দ্রমা, আকাশ, বাতাস, জল, অন্তরীক্ষ, গ্রহ, নক্ষত্রাদিসহ সমস্ত জীব ও   জড়  জগত যা আমাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে তাদের সবার উদ্দেশ্যে অঞ্জলি প্রদান করা হয়। স্বর্গ,  মর্ত‍্য ও পাতাল এই ত্রিলোকের কল‍্যাণে অঞ্জলি প্রদান করা হয়। অর্থাৎ ব্রহ্মলোক অবধি যাবতীয় গ্রহ বা নক্ষত্রলোকে যেখানে জীব বা প্রাণের বিকাশ আছে সেইসব জীবগণ, দেবগণ (ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরসহ দেবকূলের সব দেব দেবী), ঋষিগণ (মারিচ, অত্রি, অঙ্গিরাদিসহ সব ঋষিকূল), আর্য‍্য ঋষিগণ, মনুষ‍্যগণ, সপ্তদ্বীপবাসী   (জম্বু, পল্ক, শাল্মলী, কুশ, কৌঞ্চ, শাক, পুষ্কর এই সপ্তদ্বীপসহ সব দ্বীপবাসী) এবং সমোদয় মানব কূলের পিতৃপুরুষ ও মাতাদের উদ্দেশ‍্যে অঞ্জলি প্রদান করা হয়। এই হচ্ছে সনাতন ধর্মে মহালয়ার শিক্ষা  ও সংস্কার।

সমাজের প্রচলিত ধারণায় মহালয়াকে দুর্গাপূজার একটি প্রারম্ভিক অনুষ্ঠান হিসাবে গণ‍্য করে সবাই একে অন‍্যের মধ‍্যে 'শুভ মহালয়া' বলে আনন্দ ও উচ্ছাস প্রকাশ করতেন। কিন্তু মূলত এই তিথি হচ্ছে পিতৃপুরুষ ও মাতাদের উদ্দেশ‍্যে তর্পন বা তিলাঞ্জলি প্রদানের এক পূণ‍্য মূহুর্ত বা তিথি। যার সাথে বেদনার ও প্রাণের নীরব  শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদানের সম্পর্ক জড়িয়ে রয়েছে। এবার সোশ‍্যাল মিডিয়ার সুবাদে সচেনতার কারণে এর তেমন প্রচলন দেখা যায়নি। দুর্গাপূজার সূচনাকাল হচ্ছে দেবীপক্ষ। সুতরাং  আমরা 'শুভ দেবীপক্ষ' বলে সবার সাথে আনন্দ ও শুভকামনা বিনিময় করতে পারি। বিভিন্ন জায়গায় ও মন্দিরে মহালয়ার অনুষ্ঠান হয়। সেই অনুষ্ঠানকেও    আমরা 'শুভ দেবীপক্ষ' অনুষ্ঠান হিসাবে আখ‍্যায়িত করতে পারি। তাতে মহালয়ার  অনুষ্ঠান হবে পিতৃপুরুষ ও মাতাদের উদ্দেশ‍্যে অঞ্জলি প্রদান অনুষ্ঠান। আর দেবীপক্ষের অনুষ্ঠান হবে দুর্গাদেবীর জাগরণ বা দুর্গাপূজার   সূচনা অনুষ্ঠান।

পরিশেষে বছরের ১২টি মাসে ২৪টি পক্ষ রয়েছে। এর মধ‍্যে ২টি পক্ষ হচ্ছে খুবই পূণ‍্যের আলোকধারায় জ‍্যোতিস্নাত। এই দু'টি পূণ‍্য পক্ষ হচ্ছে পিতৃপক্ষ ও দেবীপক্ষ। আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষকে বলা হয় পিতৃপক্ষ। আর এ পক্ষের এক শুভ তিথিকে বলা হয় মহালয়া। পিতৃপক্ষে স্বর্গত পিতৃপুরুষ ও মাতৃদেবীদের উদ্দেশ‍্যে পূণ‍্য   পার্বন, শ্রাদ্ধ ও তর্পণ করা হয়। অন‍্যদিকে আধ‍্যাশক্তি, মহামায়া, আনন্দদাত্রী, মহাশক্তি স্বরুপা, বিশ্ববিদাত্রী,    কল‍্যাণী দেবী দুর্গাকে সাধক ও পূজারীকূল দেবীর আরাধনায় দেবীর মহাপূজার এ মহান আলয়ে আসার আহবান করেন বিধায় এই তিথিকে মহালয়া বলা হয়। মহালয়া তিথির পর প্রতিপদ তিথি থেকে শুরু হয় দেবীপক্ষ বা দেবীকে বন্দনার জন‍্য জারণ বা বোধন।

-শৈলেন কুমার দাশ
 ক্যালগেরী,কানাডা

Related posts

কাশিয়ানীতে হাইওয়ে পুলিশের বিট পুলিশিং সমাবেশ

razzak

অস্ট্রেলিয়া ফেডারেল নির্বাচন: প্রথম বাংলাদেশি মহিলা প্রার্থী সাজেদা আক্তার

razzak

জাল অক্ষত রেখে সেমিতে সিটি

razzak

Leave a Comment

Translate »